ঢাকা ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

সারাদেশে তেল চোরচক্রের বিষবৃক্ষ: ডিপো থেকে কালোবাজারে হাজার হাজার লিটার জ্বালানি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৩:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ৫৫টি ডিপোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চোরচক্রের জাল এখন সারাদেশে বিস্তৃত। প্রভাবশালী সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল খোলা বাজারে পাচার হচ্ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের সুযোগ নিয়ে এই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুরি যাওয়া বিশাল পরিমাণ তেলকে কর্তৃপক্ষ ‘সিস্টেম লস’ বা ‘ট্রান্সপোর্ট লস’ হিসেবে দেখিয়ে ধামাচাপা দেয়, যার ফলে রাঘববোয়ালরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

অতি সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা ডিপোতে যাওয়ার পথে ৪টি লরি থেকে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল গায়েব হওয়ার ঘটনা এই লুটপাটের ভয়াবহতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহা. মফিজুর রহমান এই চুরির সত্যতা স্বীকার করে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন। বিমানের এই মূল্যবান জ্বালানি মূলত কম দামে অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়।

চট্টগ্রাম ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যমুনা অয়েলের পার্বতীপুর ডিপো থেকে ২০২৪ সালের জুনে ৬ হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনা ঘটলেও রহস্যজনক কারণে তৎকালীন তদন্ত কমিটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দেড় বছর পর গত ১৫ মার্চ ওই ডিপোর অপারেটর নজরুল ইসলামসহ চার কর্মচারীকে বদলির মৌখিক সুপারিশ করা হলেও অবিশ্বাস্যভাবে একই ডিপো থেকে আরও ৪৫ হাজার লিটার তেল উধাও হয়ে গেছে। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের রক্ষা করতে কিছু ডিলারের কাছ থেকে ভুয়া পে-অর্ডার নিয়ে তেল বিক্রি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে সমির পালের নাম উঠে এসেছে, যিনি ইতিপূর্বে ২০১৭ সালে তেল পাচারের দায়ে বরখাস্ত হলেও তদবিরের জোরে পুনরায় নিয়োগ পান। এছাড়া যমুনার পতেঙ্গা গুপ্তখাল ডিপোর সাবেক ইনচার্জ হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তেল চুরির টাকায় অঢেল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, মোংলা ডিপোতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নথিপত্রের বাইরে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেল পাওয়া গেছে, যার কোনো বৈধ উৎস দেখাতে না পারায় ম্যানেজার আল আমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জের চিত্র আরও ভয়াবহ। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ফাজিলপুর এলাকায় মেঘনা ও যমুনা ডিপোর সামনে প্রকাশ্যে তেল চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। লরির ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ২০০-৫০০ লিটার বেশি তেল বহন করে মাঝপথে তা নামিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া বালুবাহী বাল্কহেডে সরাসরি জাহাজ থেকে তেল পাচারের ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক। এই চক্রের নেতৃত্বে স্বপন, কালাম, হৃদয় ও রনিসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা রয়েছেন। এমনকি যমুনা ডিপোর কর্মচারী আলী নূর ইসলাম ইমুকে পুলিশ লাইনের পাশে অবৈধভাবে তেল বিক্রি করতে দেখা গেছে।

খুলনার দৌলতপুর এলাকার তিনটি ডিপো থেকেও তেল কালোবাজারে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ১০০ টাকার ডিজেল বাইরে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুন্দরবন ট্যুর অপারেটররা জানিয়েছেন যে, পাম্পে তেল পাওয়া না গেলেও চড়া দামে বাইরে সবই পাওয়া যাচ্ছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে বর্তমানে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের নজরদারি বাড়লেও সিস্টেমের গভীরে প্রোথিত এই দুর্নীতি উপড়ে ফেলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

সারাদেশে তেল চোরচক্রের বিষবৃক্ষ: ডিপো থেকে কালোবাজারে হাজার হাজার লিটার জ্বালানি

আপডেট সময় : ১২:২৩:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ৫৫টি ডিপোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চোরচক্রের জাল এখন সারাদেশে বিস্তৃত। প্রভাবশালী সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল খোলা বাজারে পাচার হচ্ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের সুযোগ নিয়ে এই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুরি যাওয়া বিশাল পরিমাণ তেলকে কর্তৃপক্ষ ‘সিস্টেম লস’ বা ‘ট্রান্সপোর্ট লস’ হিসেবে দেখিয়ে ধামাচাপা দেয়, যার ফলে রাঘববোয়ালরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

অতি সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা ডিপোতে যাওয়ার পথে ৪টি লরি থেকে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল গায়েব হওয়ার ঘটনা এই লুটপাটের ভয়াবহতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহা. মফিজুর রহমান এই চুরির সত্যতা স্বীকার করে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন। বিমানের এই মূল্যবান জ্বালানি মূলত কম দামে অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়।

চট্টগ্রাম ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যমুনা অয়েলের পার্বতীপুর ডিপো থেকে ২০২৪ সালের জুনে ৬ হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনা ঘটলেও রহস্যজনক কারণে তৎকালীন তদন্ত কমিটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দেড় বছর পর গত ১৫ মার্চ ওই ডিপোর অপারেটর নজরুল ইসলামসহ চার কর্মচারীকে বদলির মৌখিক সুপারিশ করা হলেও অবিশ্বাস্যভাবে একই ডিপো থেকে আরও ৪৫ হাজার লিটার তেল উধাও হয়ে গেছে। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের রক্ষা করতে কিছু ডিলারের কাছ থেকে ভুয়া পে-অর্ডার নিয়ে তেল বিক্রি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে সমির পালের নাম উঠে এসেছে, যিনি ইতিপূর্বে ২০১৭ সালে তেল পাচারের দায়ে বরখাস্ত হলেও তদবিরের জোরে পুনরায় নিয়োগ পান। এছাড়া যমুনার পতেঙ্গা গুপ্তখাল ডিপোর সাবেক ইনচার্জ হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তেল চুরির টাকায় অঢেল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, মোংলা ডিপোতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নথিপত্রের বাইরে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেল পাওয়া গেছে, যার কোনো বৈধ উৎস দেখাতে না পারায় ম্যানেজার আল আমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জের চিত্র আরও ভয়াবহ। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ফাজিলপুর এলাকায় মেঘনা ও যমুনা ডিপোর সামনে প্রকাশ্যে তেল চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। লরির ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ২০০-৫০০ লিটার বেশি তেল বহন করে মাঝপথে তা নামিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া বালুবাহী বাল্কহেডে সরাসরি জাহাজ থেকে তেল পাচারের ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক। এই চক্রের নেতৃত্বে স্বপন, কালাম, হৃদয় ও রনিসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা রয়েছেন। এমনকি যমুনা ডিপোর কর্মচারী আলী নূর ইসলাম ইমুকে পুলিশ লাইনের পাশে অবৈধভাবে তেল বিক্রি করতে দেখা গেছে।

খুলনার দৌলতপুর এলাকার তিনটি ডিপো থেকেও তেল কালোবাজারে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ১০০ টাকার ডিজেল বাইরে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুন্দরবন ট্যুর অপারেটররা জানিয়েছেন যে, পাম্পে তেল পাওয়া না গেলেও চড়া দামে বাইরে সবই পাওয়া যাচ্ছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে বর্তমানে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের নজরদারি বাড়লেও সিস্টেমের গভীরে প্রোথিত এই দুর্নীতি উপড়ে ফেলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।