ঢাকা ০৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

আইন ও জামানত বিতর্কে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়: ৫ কোটির স্থলে দেড় কোটিতেই অনুমোদন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে অনুমোদিত একমাত্র বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর আইনি অনিয়মের তথ্য ফাঁস হয়েছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ ট্রাস্টের এই উদ্যোগটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটানো হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। আইনের ৬ ধারার ৯ উপধারা অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংরক্ষিত তহবিল বা জামানত হিসেবে যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে অন্যূন পাঁচ কোটি টাকা জমা থাকা বাধ্যতামূলক।

তবে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ঠিকানা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ী এলাকায় হওয়ায় এটি ঢাকা মেট্রোপলিটনের অন্তর্ভুক্ত হলেও, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের শর্তে মাত্র দেড় কোটি টাকা জমা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেখানে আগে থেকে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে ছিল, সেখানে ড. ইউনূস সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন মাত্র তিন মাসের মাথায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদন পাওয়ায় প্রশাসনিক মহলে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৭ মার্চের অনুমোদনপত্রের শর্ত অনুযায়ী, সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে দেড় কোটি টাকা জমা রাখার কথা বলা হয়েছে, যা আইনের নির্ধারিত অংকের চেয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকা কম। এই বিষয়ে বর্তমান শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব সিদ্দিক জোবায়ের একে ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ বলে অভিহিত করে দায় এড়িয়েছেন। অন্যদিকে, তৎকালীন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ এই প্রক্রিয়াকে ড. ইউনূসের প্রভাব ও শিক্ষার প্রতি তার অবদানের দোহাই দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা করেছেন।

গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আশরাফুল হাসান শুরুতে আইনের কোনো বরখেলাপ হয়নি বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে একেক সময় একেক রকম তথ্য দিয়েছেন। তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ইউজিসির একটি আংশিক চিঠি দেখিয়ে দাবি করেন যে তারা পাঁচ কোটি টাকাই জমা দিয়েছেন, যদিও মন্ত্রণালয়ের মূল অনুমোদনপত্রে দেড় কোটি টাকার শর্তটি এখনো নথিবদ্ধ রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস পূর্বাচলে হবে যা গাজীপুরের অন্তর্ভুক্ত, তাই দেড় কোটি টাকার শর্ত দেওয়া হতে পারে—যদিও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকার দিয়াবাড়ী থেকেই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যেখানে ১-২ বছর সময় নেয়, সেখানে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পরিদর্শন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত সব ধাপ মাত্র তিন মাসেই সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর আবেদনের পর মাত্র এক মাসের মধ্যে ইউজিসির উচ্চপর্যায়ের কমিটি পজিটিভ মতামত দেয় এবং ১৭ মার্চ মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে। অথচ রাজধানীর পূর্বাচলে সাউথ পয়েন্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টো গ্রান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের পজিটিভ রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর ফাইল দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে।

দিয়াবাড়ীতে গ্রামীণ ট্রাস্টের জায়গায় আটতলা দুটি ভবনে আগামী সেপ্টেম্বরেই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে আইনের শর্ত পূরণে শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি.আর. আবরার এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সব মিলিয়ে, ত্বরিত গতিতে অনুমোদন ও জামানতের অংকে নজিরবিহীন ছাড় দেওয়ার এই ঘটনাটি দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

আইন ও জামানত বিতর্কে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়: ৫ কোটির স্থলে দেড় কোটিতেই অনুমোদন

আপডেট সময় : ১২:১৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে অনুমোদিত একমাত্র বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর আইনি অনিয়মের তথ্য ফাঁস হয়েছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ ট্রাস্টের এই উদ্যোগটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটানো হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। আইনের ৬ ধারার ৯ উপধারা অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংরক্ষিত তহবিল বা জামানত হিসেবে যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে অন্যূন পাঁচ কোটি টাকা জমা থাকা বাধ্যতামূলক।

তবে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ঠিকানা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ী এলাকায় হওয়ায় এটি ঢাকা মেট্রোপলিটনের অন্তর্ভুক্ত হলেও, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের শর্তে মাত্র দেড় কোটি টাকা জমা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেখানে আগে থেকে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে ছিল, সেখানে ড. ইউনূস সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন মাত্র তিন মাসের মাথায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদন পাওয়ায় প্রশাসনিক মহলে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৭ মার্চের অনুমোদনপত্রের শর্ত অনুযায়ী, সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে দেড় কোটি টাকা জমা রাখার কথা বলা হয়েছে, যা আইনের নির্ধারিত অংকের চেয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকা কম। এই বিষয়ে বর্তমান শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব সিদ্দিক জোবায়ের একে ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ বলে অভিহিত করে দায় এড়িয়েছেন। অন্যদিকে, তৎকালীন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ এই প্রক্রিয়াকে ড. ইউনূসের প্রভাব ও শিক্ষার প্রতি তার অবদানের দোহাই দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা করেছেন।

গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আশরাফুল হাসান শুরুতে আইনের কোনো বরখেলাপ হয়নি বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে একেক সময় একেক রকম তথ্য দিয়েছেন। তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ইউজিসির একটি আংশিক চিঠি দেখিয়ে দাবি করেন যে তারা পাঁচ কোটি টাকাই জমা দিয়েছেন, যদিও মন্ত্রণালয়ের মূল অনুমোদনপত্রে দেড় কোটি টাকার শর্তটি এখনো নথিবদ্ধ রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস পূর্বাচলে হবে যা গাজীপুরের অন্তর্ভুক্ত, তাই দেড় কোটি টাকার শর্ত দেওয়া হতে পারে—যদিও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকার দিয়াবাড়ী থেকেই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যেখানে ১-২ বছর সময় নেয়, সেখানে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পরিদর্শন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত সব ধাপ মাত্র তিন মাসেই সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর আবেদনের পর মাত্র এক মাসের মধ্যে ইউজিসির উচ্চপর্যায়ের কমিটি পজিটিভ মতামত দেয় এবং ১৭ মার্চ মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে। অথচ রাজধানীর পূর্বাচলে সাউথ পয়েন্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টো গ্রান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের পজিটিভ রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর ফাইল দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে।

দিয়াবাড়ীতে গ্রামীণ ট্রাস্টের জায়গায় আটতলা দুটি ভবনে আগামী সেপ্টেম্বরেই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে আইনের শর্ত পূরণে শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি.আর. আবরার এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সব মিলিয়ে, ত্বরিত গতিতে অনুমোদন ও জামানতের অংকে নজিরবিহীন ছাড় দেওয়ার এই ঘটনাটি দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।