ঢাকা ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ইভিএম প্রকল্পে ৩৮২৫ কোটি টাকার মহাহরিলুট: গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তারিক সিদ্দিক ও টাইগার আইটির নাম

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৬:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেড় লাখ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার কোটি টাকার ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। পৃথক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই প্রকল্পের নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তার সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘টাইগার আইটি’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার এই পুরো প্রকল্পটি এখন সম্পূর্ণ গচ্চা যাওয়ার পথে এবং এতে বাজারদরের চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি মূল্য দেখিয়ে জনগণের করের টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

প্রতিটি ইভিএমের ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, অথচ সিএজি দপ্তরের অডিট অনুযায়ী এগুলোর প্রকৃত বাজারদর হওয়া উচিত ছিল মাত্র ৩৪৩ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ শুধুমাত্র মেশিন কেনাকাটাতেই ৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। তৎকালীন সিইসি নুরুল হুদা ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত এটি নামমাত্র আসনে ব্যবহৃত হয়, যা মূলত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে লুটের সুযোগ করে দেওয়ার পরিকল্পিত কৌশল ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সরকারি অডিট দপ্তরের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরেই ইভিএম কেনাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই মহাদুর্নীতির সঙ্গে তারিক সিদ্দিক ছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক সাইদুল ইসলাম, বিএমটিএফ-এর তৎকালীন এমডি সুলতানুজ্জামান মুহাম্মদ সালেহ উদ্দিন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং তৎকালীন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সরাসরি জড়িত ছিলেন। এমনকি বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘টাইগার আইটি’র মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশনের পুরো তথ্যভাণ্ডার নিয়ন্ত্রিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বিশাল বাজেটের প্রকল্পে ইভিএম রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতের জন্য কোনো অর্থই বরাদ্দ রাখা হয়নি। ফলে বর্তমানে দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে সচল আছে মাত্র ৪০ হাজারের মতো এবং বাকিগুলোর মধ্যে ২৪ হাজার একেবারেই অকেজো ও ৮৬ হাজার মেরামতযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে। শেখ হাসিনার পতনের পর বর্তমান এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই বিপুল অংকের রাষ্ট্রীয় অর্থ এখন পুরোপুরি লোকসানের তালিকায় চলে গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইভিএমের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারত বা ব্রাজিলের তথ্য কেবল ইন্টারনেট থেকে নিয়ে মনগড়াভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ইভিএমের ওয়ারেন্টি নিয়ে করা হয়েছে চরম প্রতারণা; পরিকল্পনা কমিশনকে ১০ বছরের ওয়ারেন্টির কথা বলা হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দিয়েছিল মাত্র এক বছরের ওয়ারেন্টি। ফলে মূল্যবান মেশিনগুলো নষ্ট হলেও কোনো সেবা পাওয়া যায়নি।

ইভিএম প্রকল্প পাসের সময় টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার সত্যতা মিলেছে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো বাস্তবসম্মত সমীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে এই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র কতিপয় ব্যক্তিকে লুটপাটের সুযোগ করে দিতে। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই লুটের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

ইভিএম প্রকল্পে ৩৮২৫ কোটি টাকার মহাহরিলুট: গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তারিক সিদ্দিক ও টাইগার আইটির নাম

আপডেট সময় : ১২:০৬:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেড় লাখ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার কোটি টাকার ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। পৃথক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই প্রকল্পের নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তার সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘টাইগার আইটি’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার এই পুরো প্রকল্পটি এখন সম্পূর্ণ গচ্চা যাওয়ার পথে এবং এতে বাজারদরের চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি মূল্য দেখিয়ে জনগণের করের টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

প্রতিটি ইভিএমের ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, অথচ সিএজি দপ্তরের অডিট অনুযায়ী এগুলোর প্রকৃত বাজারদর হওয়া উচিত ছিল মাত্র ৩৪৩ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ শুধুমাত্র মেশিন কেনাকাটাতেই ৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। তৎকালীন সিইসি নুরুল হুদা ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত এটি নামমাত্র আসনে ব্যবহৃত হয়, যা মূলত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে লুটের সুযোগ করে দেওয়ার পরিকল্পিত কৌশল ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সরকারি অডিট দপ্তরের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরেই ইভিএম কেনাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই মহাদুর্নীতির সঙ্গে তারিক সিদ্দিক ছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক সাইদুল ইসলাম, বিএমটিএফ-এর তৎকালীন এমডি সুলতানুজ্জামান মুহাম্মদ সালেহ উদ্দিন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং তৎকালীন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সরাসরি জড়িত ছিলেন। এমনকি বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘টাইগার আইটি’র মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশনের পুরো তথ্যভাণ্ডার নিয়ন্ত্রিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বিশাল বাজেটের প্রকল্পে ইভিএম রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতের জন্য কোনো অর্থই বরাদ্দ রাখা হয়নি। ফলে বর্তমানে দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে সচল আছে মাত্র ৪০ হাজারের মতো এবং বাকিগুলোর মধ্যে ২৪ হাজার একেবারেই অকেজো ও ৮৬ হাজার মেরামতযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে। শেখ হাসিনার পতনের পর বর্তমান এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই বিপুল অংকের রাষ্ট্রীয় অর্থ এখন পুরোপুরি লোকসানের তালিকায় চলে গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইভিএমের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারত বা ব্রাজিলের তথ্য কেবল ইন্টারনেট থেকে নিয়ে মনগড়াভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ইভিএমের ওয়ারেন্টি নিয়ে করা হয়েছে চরম প্রতারণা; পরিকল্পনা কমিশনকে ১০ বছরের ওয়ারেন্টির কথা বলা হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দিয়েছিল মাত্র এক বছরের ওয়ারেন্টি। ফলে মূল্যবান মেশিনগুলো নষ্ট হলেও কোনো সেবা পাওয়া যায়নি।

ইভিএম প্রকল্প পাসের সময় টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার সত্যতা মিলেছে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো বাস্তবসম্মত সমীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে এই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র কতিপয় ব্যক্তিকে লুটপাটের সুযোগ করে দিতে। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই লুটের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে।