ঢাকা ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে কি কেবলই যুদ্ধ নাকি সিন্ডিকেট?

দেশের জ্বালানি তেলের বাজার বর্তমানে এক চরম অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং একদিকে সরকারের নীতিনির্ধারক ও খোদ প্রধানমন্ত্রী বলছেন দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছে না। এই দুই বিপরীতধর্মী তথ্যের মাঝে পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে জরুরি সেবার যানবাহন চালকরাও।

সম্প্রতি নড়াইলে তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা এই সংকটের ভয়াবহতা ও মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নড়াইলের তুলারামপুর এলাকায় তেল না পেয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে পাম্প ম্যানেজার নাহিদকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয় বরং এটি বিদ্যমান অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মানুষের চরম উত্তেজনার ফল। সড়কে সিরিয়াল না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্স ঠেলে নিয়ে যাওয়া কিংবা তেলের জন্য পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের হাতাহাতির ঘটনাগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং প্রশ্ন উঠেছে যে এই জনরোষের দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র নেবে কি না।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের কোনো সংকট দেশে নেই কারণ এগুলো দেশেই উৎপাদিত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী পেট্রোলের শতভাগ চাহিদাই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে মেটানো হয়েছে এবং অকটেনেরও একটি বড় অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো অসংখ্য পাম্পে তেল নেই লেখা বোর্ড ঝুলছে এবং খোলা পাম্পগুলোর সামনে মাইলের পর মাইল যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্রাহকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না।

অভিযোগ উঠেছে যে এক শ্রেণির অসাধু পাম্প মালিক ও রিফাইনারি ইউনিটগুলো দাম বাড়ার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এর সত্যতাও মিলেছে। যেমন ফরিদপুরে তেল নেই লেখা পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে ২৮ হাজার লিটার তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং নাটোরে ফিলিং স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই লরি থেকে তেল চুরির দায়ে ম্যানেজারকে জরিমানা করা হয়েছে। একইভাবে যশোর ও নীলফামারীতেও অবৈধ মজুত ও অননুমোদিত বিক্রির দায়ে বিপুল পরিমাণ তেল জব্দ করা হয়েছে যা প্রমাণ করে যে সংকটের একটি বড় অংশই কৃত্রিমভাবে তৈরি।

শোনা যাচ্ছে যে বেসরকারি কনডেনসেট রিফাইনারিগুলো বাজার কারসাজির উদ্দেশ্যে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে এবং ইরান যুদ্ধের কারণে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ওপর যে বৈশ্বিক চাপ পড়েছে তাকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট চক্র রাতারাতি শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ধান্দায় লিপ্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন যে বর্তমানে ২ লাখ মেট্রিক টন তেল মজুত আছে এবং আরও ২ লাখ টন পথে রয়েছে এবং তেলের চোরাচালান বন্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে সংকটের শুরুতে সরকারি কর্মকর্তাদের অসংলগ্ন কথা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা বা প্যানিক বায়িংয়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে যা সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি তেলের মতো স্পর্শকাতর পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে কেবল আশ্বাস যথেষ্ট নয় বরং যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে বিপদে ফেলতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তেলের ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে নতুবা এই ভোগান্তি কেবল অর্থনৈতিক নয় বরং বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস ইরানের

জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে কি কেবলই যুদ্ধ নাকি সিন্ডিকেট?

আপডেট সময় : ১২:২৪:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

দেশের জ্বালানি তেলের বাজার বর্তমানে এক চরম অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং একদিকে সরকারের নীতিনির্ধারক ও খোদ প্রধানমন্ত্রী বলছেন দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছে না। এই দুই বিপরীতধর্মী তথ্যের মাঝে পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে জরুরি সেবার যানবাহন চালকরাও।

সম্প্রতি নড়াইলে তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা এই সংকটের ভয়াবহতা ও মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নড়াইলের তুলারামপুর এলাকায় তেল না পেয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে পাম্প ম্যানেজার নাহিদকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয় বরং এটি বিদ্যমান অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মানুষের চরম উত্তেজনার ফল। সড়কে সিরিয়াল না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্স ঠেলে নিয়ে যাওয়া কিংবা তেলের জন্য পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের হাতাহাতির ঘটনাগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং প্রশ্ন উঠেছে যে এই জনরোষের দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র নেবে কি না।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের কোনো সংকট দেশে নেই কারণ এগুলো দেশেই উৎপাদিত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী পেট্রোলের শতভাগ চাহিদাই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে মেটানো হয়েছে এবং অকটেনেরও একটি বড় অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো অসংখ্য পাম্পে তেল নেই লেখা বোর্ড ঝুলছে এবং খোলা পাম্পগুলোর সামনে মাইলের পর মাইল যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্রাহকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না।

অভিযোগ উঠেছে যে এক শ্রেণির অসাধু পাম্প মালিক ও রিফাইনারি ইউনিটগুলো দাম বাড়ার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এর সত্যতাও মিলেছে। যেমন ফরিদপুরে তেল নেই লেখা পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে ২৮ হাজার লিটার তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং নাটোরে ফিলিং স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই লরি থেকে তেল চুরির দায়ে ম্যানেজারকে জরিমানা করা হয়েছে। একইভাবে যশোর ও নীলফামারীতেও অবৈধ মজুত ও অননুমোদিত বিক্রির দায়ে বিপুল পরিমাণ তেল জব্দ করা হয়েছে যা প্রমাণ করে যে সংকটের একটি বড় অংশই কৃত্রিমভাবে তৈরি।

শোনা যাচ্ছে যে বেসরকারি কনডেনসেট রিফাইনারিগুলো বাজার কারসাজির উদ্দেশ্যে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে এবং ইরান যুদ্ধের কারণে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ওপর যে বৈশ্বিক চাপ পড়েছে তাকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট চক্র রাতারাতি শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ধান্দায় লিপ্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন যে বর্তমানে ২ লাখ মেট্রিক টন তেল মজুত আছে এবং আরও ২ লাখ টন পথে রয়েছে এবং তেলের চোরাচালান বন্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে সংকটের শুরুতে সরকারি কর্মকর্তাদের অসংলগ্ন কথা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা বা প্যানিক বায়িংয়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে যা সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি তেলের মতো স্পর্শকাতর পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে কেবল আশ্বাস যথেষ্ট নয় বরং যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে বিপদে ফেলতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তেলের ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে নতুবা এই ভোগান্তি কেবল অর্থনৈতিক নয় বরং বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।