অপরদিকে ফিনল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি ভারতের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতেও শারীরিক শিক্ষাকে মূল পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব দেশে প্রতিটি স্কুলে ক্রীড়া শিক্ষক, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম ও মাঠের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা অন্তত সপ্তাহে তিন দিন নির্দিষ্ট সময় খেলাধুলায় অংশ নেয়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে।
আমরা জানি ইউনেস্কো নিয়মিতভাবে কোয়ালিটি ফিজিক্যাল এডুকেশন সম্পর্কিত নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রকাশ করে থাকে। তাদের ২০২৩ সালের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে “শারীরিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবোধ, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়”। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এখনও একজন পূর্ণকালীন শরীরচর্চা শিক্ষক পর্যন্ত নেই। অনেক বিদ্যালয়ে “খেলার সময়” বলতে বোঝায় ক্লাস ফাঁকা থাকলে মাঠে যাওয়া।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ৫–১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেয় না। এর ফলে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক চাপের হার বেড়েই চলেছে।
এছাড়াও সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন নামের একটি সংস্থা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জনস্বাস্থ্য সংস্থা, তারা রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনা করে। তাদের ২০২১ সালে ‘ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি ফর স্টুডেন্ট’ নামের এক গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত শরীরচর্চায় অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীরা ২০ শতাংশের বেশি মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হয় ক্লাসে।
‘নিউজ-মেডিক্যাল’ যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি বৈজ্ঞানিক নিউজ পোর্টাল। এদের কাজ মূলত চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও স্পোর্টস সায়েন্স সম্পর্কিত সাম্প্রতিক গবেষণা ও খবর প্রকাশ করা। ২০২৪ সালে তাদের এক স্টাডিতে দেখা যায়, স্কুলভিত্তিক শারীরিক কার্যক্রম শিশুদের কার্ডিওভাসকুলার ফিটনেস ও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।
পাব-মেড একটি বিশাল অনলাইন ডাটাবেজ, যেখানে মেডিসিন, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও স্পোর্টস সায়েন্স সম্পর্কিত লক্ষ লক্ষ গবেষণাপত্র সংরক্ষিত আছে। এটি পরিচালিত হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তাদের ২০০৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘ফিজিক্যাল এডুকেশনের সময় বাড়ালে অ্যাকাডেমিক ফলাফলে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না, বরং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়ে।‘
সুতরাং আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে এটি পরিষ্কার যে শারীরিক শিক্ষায় আমাদের সাথে অন্যান্য অনেক দেশের পার্থক্য রাত আর দিন। কিন্তু আমরা সবাই জানি, সুস্থ দেহে সুস্থ মনই একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ। শারীরিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুরা শুধু খেলাধুলা শেখে না, শেখে সহযোগিতা, দলীয় চেতনা, আত্মশৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব, যা ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে তাদের দৃঢ় ভিত্তি দেয়। প্রতিটি বিদ্যালয় যদি শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সেই বিদ্যালয় সত্যিই হয়ে উঠবে “সুস্থ জাতি গড়ার কারখানা।”
বাংলাদেশের উচিত এখনই আন্তর্জাতিক উদাহরণ অনুসরণ করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক নিয়োগ, মানসম্মত মাঠ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং শারীরিক শিক্ষাকে মূল পাঠ্যসূচির অপরিহার্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। কারণ, একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে অগ্রসর হয়, যখন তার শিক্ষা মস্তিষ্কের পাশাপাশি শরীরকেও সমানভাবে বিকাশের সুযোগ দেয়।
অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক নিয়োগের আগের বিধিমালায় চার ধরনের সহকারী শিক্ষক পদের মধ্যে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত ছিল (ডেইলি স্টার, ২০২৪) কিন্তু সাম্প্রতিক সংস্করণে এই দুই পদ বাদ দেওয়া হয়েছে । এই পরিবর্তন শিক্ষা ব্যবস্থায় শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। অথচ দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন ঘটাতে হলে এর ভিত্তি তৈরি করতে হবে স্কুল পর্যায় থেকেই।
যদি আমরা জাতীয় দলের পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, যদি চাই ক্রিকেট বা ফুটবলে সাফল্য আসুক, তাহলে প্রথমেই নজর দিতে হবে ভিত্তির দিকে। বর্তমানে আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন রুটিনে শারীরিক অনুশীলনের সুযোগ নেই। এর ফলে শারীরিক সক্ষমতা ও স্পোর্টসম্যানশিপের অভাব দেখা দিচ্ছে, যা পরবর্তী পর্যায়ে দক্ষ খেলোয়াড় তৈরি করায় বাধা দিচ্ছে।
শারীরিক শিক্ষা শুধু পেশাদার খেলোয়াড় তৈরির মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি সুস্থ জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম শিশুদের হৃদরোগ, স্থূলতা, মানসিক চাপসহ নানা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে । তাই প্রতিটি বিদ্যালয়ের আঙিনা হওয়া উচিত একটি “সুস্থ জাতি গড়ার কারখানা”, যেখানে শিশুরা শিখবে শুধু পাঠ্যবই নয়, বরং জীবনদক্ষতা, দলীয় চেতনা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মূল্যবোধ।
বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হলে শারীরিক শিক্ষাকে আর ঐচ্ছিক রাখা চলবে না। বরং এটি বাধ্যতামূলক করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উপযুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি জাতির মেধা ও শক্তি দুটোই প্রয়োজন, আর শারীরিক শিক্ষা সেই সেতুবন্ধন গড়ে দেয়। আমরা যদি চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু পরীক্ষায় নয়, জীবনে সফল হোক—তাহলে শরীরচর্চাকে শিক্ষার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতেই হবে।
তাই সময় এসেছে এটা বলার “শারীরিক শিক্ষা হোক বাধ্যতামূলক, আর প্রতিটি বিদ্যালয় হোক সুস্থ জাতি গড়ার কারখানা।”
লেখক: ক্রীড়া শিক্ষক, স্কলাসটিকা
রিপোর্টারের নাম 

























