রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু আইসিইউ বিভাগ এখন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। গত ১০ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১৮ দিনে এখানে আইসিইউ শয্যার অভাবে প্রাণ হারিয়েছে ৫১টি শিশু। এই শিশুদের প্রত্যেকেরই জরুরি নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন ছিল এবং চিকিৎসকরা তাদের আইসিইউতে স্থানান্তরের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু হাসপাতালের মাত্র ১০টি শয্যার বিপরীতে দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকায় আটকা পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে তারা। মর্মান্তিক বিষয় হলো, অনেক শিশুর সিরিয়াল যখন এসেছে, তার আগেই তারা কবরে চলে গেছে।
অপেক্ষার প্রহর যখন চিরস্থায়ী হয়: চাঁপাইনবাবগঞ্জের তমা বেগমের ১৫ মাসের সন্তান সাইফান ২১ দিন নিউমোনিয়ার সঙ্গে লড়াই করে আইসিইউ-র সিরিয়াল না পেয়ে গত ২৪ মার্চ মারা যায়। সাইফানের সিরিয়াল ছিল ২২ নম্বরে। দুই দিন অপেক্ষা করেও শয্যা না পেয়ে তমা বেগম ও তাঁর স্বামী ছেলেকে নিয়ে ঢাকার ডিআরবি হাসপাতালে ছুটলেও ভর্তির দুই ঘণ্টা পরই সব শেষ হয়ে যায়। একইভাবে পাবনার চাটমোহরের আড়াই বছরের শিশু নুসাইবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আইসিইউ-র অপেক্ষায় থেকে ১২ মার্চ মারা যায়। তার মৃত্যুর চার দিন পর হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয় যে ‘বেড ফাঁকা হয়েছে’।
মৃত্যুর পর সিরিয়াল পাওয়ার ট্র্যাজেডি: সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে চার মাসের শিশু আনাসের ক্ষেত্রে। ১৩ মার্চ ভর্তি হওয়া আনাসের সিরিয়াল ছিল ৩৮ নম্বরে। দুই দিন পর ১৫ মার্চ আনাস মারা যাওয়ার পর তাকে শিবগঞ্জে দাফন করা হয়। ১৭ মার্চ হাসপাতাল থেকে ফোন আসে—‘বেড ফাঁকা হয়েছে, আনাসকে নিয়ে আসেন’। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আনাসের বাবা শামির উদ্দিন বলেন, “ছেলের আশা আর পূরণ হলো না, আইসিইউ না পেয়ে শ্বাসকষ্টেই বাচ্চাটা মারা গেল।”
সরেজমিনে ভোগান্তির চিত্র: হাসপাতালের নতুন ভবনের পঞ্চম তলায় শিশু আইসিইউ-র সামনে গতকালও দেখা গেছে বাবা-মায়েদের আহাজারি। ৪ বছরের আদিব হাসানের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও তার সিরিয়াল ৪১ নম্বরে। কুষ্টিয়া থেকে আসা ১০ মাসের সাফোয়ানের বাবাও ৪১ নম্বর সিরিয়াল দেখে দিশেহারা। ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার সামর্থ্য নেই এমন অসংখ্য মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার এখন রামেক হাসপাতালের এই অব্যবস্থাপনার বলি হচ্ছে।
চিকিৎসকদের বক্তব্য ও সীমাবদ্ধতা: রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যদি এই শিশুদের সময়মতো আইসিইউতে ভর্তি করা যেত, তবে কমপক্ষে ৭০ শতাংশ শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হতো। ১ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত আইসিইউতে ১০৪টি শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ৩১ জন মারা গেছে। অর্থাৎ আইসিইউ-র ভেতরে সেবার মান ভালো হলেও বাইরে থাকা মুমূর্ষু শিশুদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শিশু সিরিয়ালে থাকছে, কিন্তু শয্যা মাত্র ১০টি।
রামেক হাসপাতালের এই তীব্র শয্যা সংকট নিরসনে দ্রুত আইসিইউ ইউনিট সম্প্রসারণ করা না হলে এই লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিপোর্টারের নাম 

























