ঢাকা ১২:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

৯ লাখ কোটির বিশাল বাজেট: প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ঋণের জালে জড়ানোর শঙ্কা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৬:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি রেকর্ড আকারের বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটের আকার প্রথমবারের মতো ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে বড় ব্যয়ের সংস্থান করতে গিয়ে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর ব্যাপক মাত্রায় নির্ভরশীল হতে হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই বিশাল বাজেটের পরিকল্পনা যেমন উচ্চাভিলাষী, তেমনি চ্যালেঞ্জিং। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো যেমন—ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ এবং খাল পুনঃখননের মতো প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা। শুধুমাত্র ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্যই প্রথম বছরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যয়ের এই বিশাল বহরের বিপরীতে রাজস্ব আদায়ের চিত্রটি বেশ মলিন। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজস্ব আদায়ে এমন স্থবিরতার মধ্যেই আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা আরও এক লাখ কোটি টাকা বাড়িয়ে ভ্যাট আদায়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করছে অর্থ বিভাগ। তবুও রাজস্বের এই ঘাটতির ফলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি ছুঁয়ে ফেলবে।

বাজেটের এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ওপরও নির্ভরতা বাড়ছে। আগামী সপ্তাহে আইএমএফের কাছ থেকে ১৩০ কোটি ডলারের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় এবং অতিরিক্ত ২০০ কোটি ডলার ঋণের আবেদন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও গ্যাসের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির বোঝা চেপেছে সরকারের কাঁধে।

অর্থনীতিবিদরা এই বাজেটকে একটি ‘সংকটকালীন বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করছেন। সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সরকারের জন্য একটি কঠিন সমীকরণ। বিশেষ করে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বড় বাজেটের এই চাপ সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিলে সংসদের সিলমোহর: রাজপথে নয়, লড়াই এবার উচ্চ আদালতে?

৯ লাখ কোটির বিশাল বাজেট: প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ঋণের জালে জড়ানোর শঙ্কা

আপডেট সময় : ১০:৪৬:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি রেকর্ড আকারের বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটের আকার প্রথমবারের মতো ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে বড় ব্যয়ের সংস্থান করতে গিয়ে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর ব্যাপক মাত্রায় নির্ভরশীল হতে হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই বিশাল বাজেটের পরিকল্পনা যেমন উচ্চাভিলাষী, তেমনি চ্যালেঞ্জিং। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো যেমন—ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ এবং খাল পুনঃখননের মতো প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা। শুধুমাত্র ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্যই প্রথম বছরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যয়ের এই বিশাল বহরের বিপরীতে রাজস্ব আদায়ের চিত্রটি বেশ মলিন। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজস্ব আদায়ে এমন স্থবিরতার মধ্যেই আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা আরও এক লাখ কোটি টাকা বাড়িয়ে ভ্যাট আদায়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করছে অর্থ বিভাগ। তবুও রাজস্বের এই ঘাটতির ফলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি ছুঁয়ে ফেলবে।

বাজেটের এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ওপরও নির্ভরতা বাড়ছে। আগামী সপ্তাহে আইএমএফের কাছ থেকে ১৩০ কোটি ডলারের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় এবং অতিরিক্ত ২০০ কোটি ডলার ঋণের আবেদন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও গ্যাসের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির বোঝা চেপেছে সরকারের কাঁধে।

অর্থনীতিবিদরা এই বাজেটকে একটি ‘সংকটকালীন বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করছেন। সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সরকারের জন্য একটি কঠিন সমীকরণ। বিশেষ করে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বড় বাজেটের এই চাপ সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।