বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট এখন আর কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি ভয়াবহ জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং অভ্যন্তরীণ মজুত কমে আসায় এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারের ওপরে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার (৫ বিলিয়ন ডলার) বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে।
সংকটের মূলে ভূ-রাজনীতি: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও এলপিজি সরবরাহে ধস নামে। আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ এই ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেলের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং শুরু হয়েছে, যা শিল্প ও কৃষি খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
শিল্প ও এসএমই খাতের বিপর্যয়: গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান জানান, দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের অন্তর্ভুক্ত, যা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ নিশ্চিত করে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই খাতটি এখন ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ বা শিল্পায়নহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি ব্যাপক বেকারত্বের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি: দেশের জিডিপিতে ১৩ শতাংশ অবদান রাখা কৃষি খাত এখন ডিজেল ও সারের সংকটে ধুঁকছে। সেচ পাম্প চালাতে ডিজেল না পাওয়া এবং গ্যাস সংকটে সারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ফসলের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সামাজিক ও পরিবহন অস্থিরতা: তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং তেল না পেয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার সংঘর্ষ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাস, ট্রাক ও ট্রেনের ভাড়া বেড়েছে, যা নিচু ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করেছে। মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ছেড়ে গণপরিবহনে ঝুঁকছে, কিন্তু সেখানেও তীব্র যানবাহন সংকট স্কুল-কলেজ ও অফিসগামীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ: জ্বালানি আমদানিতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বাজেটে নির্ধারিত ভর্তুকির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ এখন জ্বালানি খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে, যা উন্নয়ন বাজেটকে সংকুচিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি ও বায়ো-ফুয়েলের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করার শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। যদি এখনই বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে দেশ না এগোয়, তবে অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রিপোর্টারের নাম 

























