ঢাকা ০৪:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

সংবিধান সংস্কার পরিষদ: বৈধতা ও জনসার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি উৎসবমুখর পরিবেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে নির্বাচনের পরপরই একটি অপ্রত্যাশিত ঘোষণা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শাসক দলের নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। অথচ, জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এ এই পরিষদের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যপদ্ধতি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে।

এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুটি প্রধান আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। প্রথমত, বলা হচ্ছে—১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, ফলে এর ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, যেহেতু সংবিধান সংস্কার পরিষদের জন্য আলাদা কোনো নির্বাচন হয়নি, তাই সংসদ সদস্যদের এই পরিষদের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নেই। এই আপত্তিগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য, তা বিচার করতে হলে আমাদের বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাতে হবে।

রাষ্ট্রপতির আদেশ: লিখিত সংবিধান বনাম সাংবিধানিক মুহূর্ত

এটি সত্য যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেই কি কোনো আইনি পদক্ষেপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে জুলাই বিপ্লবোত্তর সাংবিধানিক বাস্তবতায়।

জুলাইয়ের রাজনৈতিক উত্থানকে কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর সঠিক মূল্যায়ন হবে না। বরং এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ‘সাংবিধানিক মুহূর্ত’—এমন একটি সময় যখন জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রের কাঠামো, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে সক্রিয়ভাবে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতার পর এত ব্যাপক নাগরিক সম্পৃক্ততা খুব কমই দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে কেবল ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধারার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করা বাস্তবতাবিবর্জিত। বরং এর বৈধতার উৎস খুঁজতে হবে জনগণের সেই সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যে, যার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি উঠেছিল। অর্থাৎ, এখানে কার্যকর হয়েছে জনগণের ‘constituent power’—রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা।

এমন একটি অসাধারণ সাংবিধানিক রূপান্তরকে সাধারণ আইনি মানদণ্ডে বিচার করা মৌলিক ভুল। যারা এখনো ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনুচ্ছেদে এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি খুঁজছেন, তারা এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের গভীরতাকে অনুধাবন করতে পারছেন না।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুঝুঁকি ও লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

সংবিধান সংস্কার পরিষদ: বৈধতা ও জনসার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

আপডেট সময় : ১০:৪৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি উৎসবমুখর পরিবেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে নির্বাচনের পরপরই একটি অপ্রত্যাশিত ঘোষণা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শাসক দলের নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। অথচ, জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এ এই পরিষদের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যপদ্ধতি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে।

এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুটি প্রধান আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। প্রথমত, বলা হচ্ছে—১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, ফলে এর ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, যেহেতু সংবিধান সংস্কার পরিষদের জন্য আলাদা কোনো নির্বাচন হয়নি, তাই সংসদ সদস্যদের এই পরিষদের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নেই। এই আপত্তিগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য, তা বিচার করতে হলে আমাদের বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাতে হবে।

রাষ্ট্রপতির আদেশ: লিখিত সংবিধান বনাম সাংবিধানিক মুহূর্ত

এটি সত্য যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেই কি কোনো আইনি পদক্ষেপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে জুলাই বিপ্লবোত্তর সাংবিধানিক বাস্তবতায়।

জুলাইয়ের রাজনৈতিক উত্থানকে কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর সঠিক মূল্যায়ন হবে না। বরং এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ‘সাংবিধানিক মুহূর্ত’—এমন একটি সময় যখন জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রের কাঠামো, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে সক্রিয়ভাবে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতার পর এত ব্যাপক নাগরিক সম্পৃক্ততা খুব কমই দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে কেবল ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধারার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করা বাস্তবতাবিবর্জিত। বরং এর বৈধতার উৎস খুঁজতে হবে জনগণের সেই সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যে, যার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি উঠেছিল। অর্থাৎ, এখানে কার্যকর হয়েছে জনগণের ‘constituent power’—রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা।

এমন একটি অসাধারণ সাংবিধানিক রূপান্তরকে সাধারণ আইনি মানদণ্ডে বিচার করা মৌলিক ভুল। যারা এখনো ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনুচ্ছেদে এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি খুঁজছেন, তারা এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের গভীরতাকে অনুধাবন করতে পারছেন না।