ঢাকা ০৭:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

মৌলবাদ থেকে উগ্রবাদ: বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক বয়ানের বিবর্তন

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক বয়ান দেশটির পথ ও স্বরূপ নির্ধারণে একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এসব বয়ানের সঙ্গে প্রকৃত জনমত বা জনসমর্থনের গভীরতা কতটা, তা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়েছে। দেশের মানুষের সংস্কৃতি, আদর্শ এবং ভাবনাকে বিবেচনায় না নিয়েই বাঙালি ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতো ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এই ধারণাগুলো এমন এক বিভাজন তৈরি করেছে, যা একদিকে বাঙালি ও অন্যদিকে মুসলমান পরিচয়ের মধ্যে একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি পরিকল্পিতভাবে এই বিভাজনমূলক বয়ান বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ইসলামবিদ্বেষী ও অপরিণামদর্শী বয়ান আমাদের রাজনৈতিক বিভাজনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে এবং আজও এর প্রভাব বিদ্যমান। এই মৌলিক বিভাজনের ধারণাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে আরও নানা ধরনের বয়ানের উদ্ভব হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই বয়ানগুলোর রূপান্তর ঘটেছে, তবে এর মূল লক্ষ্য—ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতি বজায় রাখা—অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিভাজনমূলক রাজনীতির এই বয়ানকে টিকিয়ে রাখতে দেশ স্বাধীনের পরপরই একটি বিশেষ ক্ষমতালোভী গোষ্ঠী তৈরি হয়। শুরুতে বামপন্থী এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রভাবপুষ্ট, পশ্চিমা সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা মোহগ্রস্ত বুদ্ধিজীবী (colonized intellectuals) এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিল। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে একটি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যাদের অনেকেই বিপুল পরিমাণ পুঁজি লুণ্ঠনের সাথে জড়িত ছিল। এই পুঁজিপতি শ্রেণি আদর্শগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। পরবর্তীতে এই নব্য পুঁজিপতি গোষ্ঠী এলিট অ্যালায়েন্সের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং এর ফলে এলিট অ্যালায়েন্সে একটি কৌশলগত পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের ফলে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা বয়ান নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর গণমাধ্যমে ব্যাপক বিনিয়োগ হয় এবং একটি নতুন ধারার সূচনা হয়। পুঁজি লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠী সংবাদপত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এসব সংবাদপত্রে লেখার মাধ্যমে একদিকে যেমন জীবিকা নির্বাহ করত, তেমনি সুনামও অর্জন করত। ফলে উভয় গোষ্ঠীর জন্যই এটি একটি লাভজনক (win-win) পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘দম’ জয় করছে আমেরিকা, ‘প্রেশার কুকার’ যাচ্ছে লন্ডনে

মৌলবাদ থেকে উগ্রবাদ: বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক বয়ানের বিবর্তন

আপডেট সময় : ১০:৪৫:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক বয়ান দেশটির পথ ও স্বরূপ নির্ধারণে একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এসব বয়ানের সঙ্গে প্রকৃত জনমত বা জনসমর্থনের গভীরতা কতটা, তা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়েছে। দেশের মানুষের সংস্কৃতি, আদর্শ এবং ভাবনাকে বিবেচনায় না নিয়েই বাঙালি ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতো ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এই ধারণাগুলো এমন এক বিভাজন তৈরি করেছে, যা একদিকে বাঙালি ও অন্যদিকে মুসলমান পরিচয়ের মধ্যে একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি পরিকল্পিতভাবে এই বিভাজনমূলক বয়ান বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ইসলামবিদ্বেষী ও অপরিণামদর্শী বয়ান আমাদের রাজনৈতিক বিভাজনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে এবং আজও এর প্রভাব বিদ্যমান। এই মৌলিক বিভাজনের ধারণাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে আরও নানা ধরনের বয়ানের উদ্ভব হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই বয়ানগুলোর রূপান্তর ঘটেছে, তবে এর মূল লক্ষ্য—ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতি বজায় রাখা—অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিভাজনমূলক রাজনীতির এই বয়ানকে টিকিয়ে রাখতে দেশ স্বাধীনের পরপরই একটি বিশেষ ক্ষমতালোভী গোষ্ঠী তৈরি হয়। শুরুতে বামপন্থী এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রভাবপুষ্ট, পশ্চিমা সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা মোহগ্রস্ত বুদ্ধিজীবী (colonized intellectuals) এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিল। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে একটি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যাদের অনেকেই বিপুল পরিমাণ পুঁজি লুণ্ঠনের সাথে জড়িত ছিল। এই পুঁজিপতি শ্রেণি আদর্শগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। পরবর্তীতে এই নব্য পুঁজিপতি গোষ্ঠী এলিট অ্যালায়েন্সের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং এর ফলে এলিট অ্যালায়েন্সে একটি কৌশলগত পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের ফলে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা বয়ান নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর গণমাধ্যমে ব্যাপক বিনিয়োগ হয় এবং একটি নতুন ধারার সূচনা হয়। পুঁজি লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠী সংবাদপত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এসব সংবাদপত্রে লেখার মাধ্যমে একদিকে যেমন জীবিকা নির্বাহ করত, তেমনি সুনামও অর্জন করত। ফলে উভয় গোষ্ঠীর জন্যই এটি একটি লাভজনক (win-win) পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।