ঢাকা ০৩:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: প্রবাসী আয়ে প্রভাব ও প্রবাসীদের উৎকণ্ঠা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স প্রবাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতসহ প্রায় ১০-১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের পাল্টা হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে এসব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনা।

তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। প্রবাসীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কাজ বা বেতন নিয়ে তাঁদের সরাসরি কোনো সমস্যা না হলেও যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং এর পরিধি বৃদ্ধি নিয়ে তাঁরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাহাজপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

তবে আশার কথা হলো, যুদ্ধের দামামা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত রেমিটেন্স প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনে প্রবাসী আয় এসেছে ২২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫.৭ শতাংশ বেশি। পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করেই মূলত প্রবাসীরা দেশে বেশি টাকা পাঠাচ্ছেন।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যার মধ্যে একক দেশ হিসেবে সৌদি আরব থেকে আসে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশের বেশি। গত ফেব্রুয়ারি মাসেও মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ থেকে মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৪৫.৯৪ শতাংশ সংগৃহীত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে মার্চের শেষে রেমিটেন্স আহরণে নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধের ময়দানে থাকা প্রবাসীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকারগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ অ্যাপ ও সতর্কবার্তার মাধ্যমে তাঁদের নিরাপদ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরবের আরামকো তেল কোম্পানিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানিয়েছেন, হামলার পর কিছু ইউনিট বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন সময়মতো দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে কোম্পানি।

কাতার ও কুয়েতে অবস্থানরত প্রবাসীরা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলেও জনজীবনে এখনো স্থবিরতা আসেনি, তবে নিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবন্দর বন্ধ রাখা এবং ভিডিও শেয়ারিংয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রবাসীরা ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে রেমিটেন্স পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা পরোক্ষভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রেমিটেন্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সেতুর অভাবে রংপুরের তারাগঞ্জে ২০ গ্রামের হাজারো মানুষের দুর্ভোগ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: প্রবাসী আয়ে প্রভাব ও প্রবাসীদের উৎকণ্ঠা

আপডেট সময় : ১২:০৮:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স প্রবাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতসহ প্রায় ১০-১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের পাল্টা হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে এসব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনা।

তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। প্রবাসীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কাজ বা বেতন নিয়ে তাঁদের সরাসরি কোনো সমস্যা না হলেও যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং এর পরিধি বৃদ্ধি নিয়ে তাঁরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাহাজপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

তবে আশার কথা হলো, যুদ্ধের দামামা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত রেমিটেন্স প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনে প্রবাসী আয় এসেছে ২২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫.৭ শতাংশ বেশি। পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করেই মূলত প্রবাসীরা দেশে বেশি টাকা পাঠাচ্ছেন।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যার মধ্যে একক দেশ হিসেবে সৌদি আরব থেকে আসে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশের বেশি। গত ফেব্রুয়ারি মাসেও মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ থেকে মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৪৫.৯৪ শতাংশ সংগৃহীত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে মার্চের শেষে রেমিটেন্স আহরণে নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধের ময়দানে থাকা প্রবাসীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকারগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ অ্যাপ ও সতর্কবার্তার মাধ্যমে তাঁদের নিরাপদ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরবের আরামকো তেল কোম্পানিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানিয়েছেন, হামলার পর কিছু ইউনিট বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন সময়মতো দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে কোম্পানি।

কাতার ও কুয়েতে অবস্থানরত প্রবাসীরা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলেও জনজীবনে এখনো স্থবিরতা আসেনি, তবে নিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবন্দর বন্ধ রাখা এবং ভিডিও শেয়ারিংয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রবাসীরা ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে রেমিটেন্স পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা পরোক্ষভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রেমিটেন্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।