ঢাকা ০৭:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

শাম বিজয়ে আবু বকর (রা.)-এর রণকৌশল ও যুদ্ধের কালজয়ী নীতিমালা

৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ বা ১৩ হিজরির শুরুর দিকে ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) শাম অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ঐতিহাসিক অভিযানের রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে তিনি মদিনার মসজিদে নববিতে একটি সাধারণ সভা আহ্বান করেন। সভায় উপস্থিত মুসলিমদের সামনে তিনি এক উদ্দীপনামূলক ভাষণ প্রদান করেন, যা যোদ্ধাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও সাহসের সঞ্চার করে।

খলিফা আবু বকর (রা.) অত্যন্ত সুচিন্তিত রণকৌশলের অংশ হিসেবে চারজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেনাপতিকে নির্বাচন করেন। বাইজেন্টাইন বাহিনীকে বিভক্ত করে তাদের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে অভিযানের নির্দেশ দেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমর ইবনুল আসকে ফিলিস্তিনে, ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ানকে দামেস্কে, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে হোমস ও মধ্য সিরিয়ায় এবং শুরাহবিল বিন হাসানাহকে জর্ডান অভিমুখে প্রেরণ করা হয়।

মুসলিম বাহিনী যখন মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করে, তখন খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পাশে হেঁটে এক অনন্য বিনয় ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যাত্রাপথে তিনি যুদ্ধের কিছু কালজয়ী নৈতিক নীতিমালা প্রদান করেন, যা আজও বিশ্ব ইতিহাসে মানবিক যুদ্ধের অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর দেওয়া নির্দেশনার মধ্যে অন্যতম ছিল—যুদ্ধ চলাকালীন কোনো অবস্থাতেই নিরপরাধ নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর আক্রমণ করা যাবে না।

রণক্ষেত্রেও প্রকৃতির সুরক্ষায় খলিফা ছিলেন আপসহীন। তিনি নির্দেশ দেন যে, কোনো ফলদ গাছ কাটা যাবে না এবং শস্যক্ষেত বা বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া গির্জা বা উপাসনালয়ে নিভৃতে ইবাদতরত ধর্মগুরু ও সন্ন্যাসীদের বিরক্ত না করা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। খলিফা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, কোনো উপাসনালয় ধ্বংস করা যাবে না।

মানবিকতা ও শৃঙ্খলার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে খলিফা নির্দেশ দেন যে, শত্রুর মৃতদেহ কোনোভাবেই বিকৃত করা যাবে না। যুদ্ধের ময়দানে কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা বা বর্বরতা প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে তিনি সেনাপতিদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় খাদ্য ছাড়া গবাদি পশু জবাই করা এবং যুদ্ধের সম্পদের লুটপাট করাও ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খলিফা আবু বকর (রা.)-এর এই সুশৃঙ্খল ও সাহসী পদক্ষেপ বিশ্ব ইতিহাসে ন্যায়বিচার ও মানবিক যুদ্ধের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হত্যাচেষ্টা মামলায় জামিন পেলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতা রিয়াদ

শাম বিজয়ে আবু বকর (রা.)-এর রণকৌশল ও যুদ্ধের কালজয়ী নীতিমালা

আপডেট সময় : ০৬:০২:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ বা ১৩ হিজরির শুরুর দিকে ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) শাম অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ঐতিহাসিক অভিযানের রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে তিনি মদিনার মসজিদে নববিতে একটি সাধারণ সভা আহ্বান করেন। সভায় উপস্থিত মুসলিমদের সামনে তিনি এক উদ্দীপনামূলক ভাষণ প্রদান করেন, যা যোদ্ধাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও সাহসের সঞ্চার করে।

খলিফা আবু বকর (রা.) অত্যন্ত সুচিন্তিত রণকৌশলের অংশ হিসেবে চারজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেনাপতিকে নির্বাচন করেন। বাইজেন্টাইন বাহিনীকে বিভক্ত করে তাদের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে অভিযানের নির্দেশ দেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমর ইবনুল আসকে ফিলিস্তিনে, ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ানকে দামেস্কে, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে হোমস ও মধ্য সিরিয়ায় এবং শুরাহবিল বিন হাসানাহকে জর্ডান অভিমুখে প্রেরণ করা হয়।

মুসলিম বাহিনী যখন মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করে, তখন খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পাশে হেঁটে এক অনন্য বিনয় ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যাত্রাপথে তিনি যুদ্ধের কিছু কালজয়ী নৈতিক নীতিমালা প্রদান করেন, যা আজও বিশ্ব ইতিহাসে মানবিক যুদ্ধের অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর দেওয়া নির্দেশনার মধ্যে অন্যতম ছিল—যুদ্ধ চলাকালীন কোনো অবস্থাতেই নিরপরাধ নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর আক্রমণ করা যাবে না।

রণক্ষেত্রেও প্রকৃতির সুরক্ষায় খলিফা ছিলেন আপসহীন। তিনি নির্দেশ দেন যে, কোনো ফলদ গাছ কাটা যাবে না এবং শস্যক্ষেত বা বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া গির্জা বা উপাসনালয়ে নিভৃতে ইবাদতরত ধর্মগুরু ও সন্ন্যাসীদের বিরক্ত না করা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। খলিফা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, কোনো উপাসনালয় ধ্বংস করা যাবে না।

মানবিকতা ও শৃঙ্খলার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে খলিফা নির্দেশ দেন যে, শত্রুর মৃতদেহ কোনোভাবেই বিকৃত করা যাবে না। যুদ্ধের ময়দানে কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা বা বর্বরতা প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে তিনি সেনাপতিদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় খাদ্য ছাড়া গবাদি পশু জবাই করা এবং যুদ্ধের সম্পদের লুটপাট করাও ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খলিফা আবু বকর (রা.)-এর এই সুশৃঙ্খল ও সাহসী পদক্ষেপ বিশ্ব ইতিহাসে ন্যায়বিচার ও মানবিক যুদ্ধের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।