দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি বা ‘সেল’ গঠন করা হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। এই প্রতিরোধ সেলগুলো মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, বাস্তবে এদের কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। ফলস্বরূপ, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার পেতে জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হয়রানির শিকার হলেও তারা অভিযোগ দিতে ভয় পান এই আশঙ্কায় যে বিচার মিলবে না বা উল্টো হয়রানির শিকার হতে হতে পারে। অনেকে আবার জানেই না যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কোনো কমিটি বা সেল রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেলগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ না করায় অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে এবং প্রশাসনিক গাফিলতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।
বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যৌন হয়রানি সেল গঠিত হলেও তা নিষ্ক্রিয়। কোথাও নিয়মিত সভা হয় না, কোথাও অভিযোগের জন্য নির্দিষ্ট হেল্পলাইন বা ওয়েব ফর্মের ব্যবস্থা নেই, এবং কোথাও অভিযোগ গ্রহণে মৌখিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউজিসিরও নেই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। তবে ইউজিসি জানিয়েছে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তারা শীঘ্রই জাতিসংঘের (UN) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) আইনজীবী শাহিনুজ্জামান বলেন, সেলের নিষ্ক্রিয় থাকা সরাসরি হাইকোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘনের শামিল এবং এই অবহেলার দায় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিতে হবে। তিনি এটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। তবে এক্ষেত্রে খুব কম শিক্ষকেরই শাস্তি নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০টি অভিযোগ পাওয়া গেলেও একটিও নিষ্পত্তি করতে পারেনি কমিটি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি অভিযোগের মধ্যে একটি নিষ্পত্তি হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে, তবে দুয়েকটি নিষ্পত্তি হলেও বাকিগুলো অপেক্ষমাণ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি অভিযোগের সমাধান করেছে (যার মধ্যে দুটি প্রত্যাহার হয়েছে)।
একজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, অভিযুক্ত শিক্ষক উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার বিচার হয়নি। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও নিষ্পত্তি হয়নি। অন্যদিকে, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলগুলোও নিষ্ক্রিয় বা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৭টি অভিযোগের মধ্যে ২২টি নিষ্পত্তি হয়েছে।
২০২৪ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, অধিকাংশ অভিযোগ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এবং ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ভয়ে অভিযোগ করেন না। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নিপীড়কদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ সহপাঠী, ১১ শতাংশ বহিরাগত এবং ৯ শতাংশ শিক্ষক। নির্যাতনের ধরনে ৩০ শতাংশ বাজে মন্তব্য, ৬০ শতাংশ সাইবার হয়রানি ও ১০ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন অন্তর্ভুক্ত। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বহু প্রতিষ্ঠানে এসব সেল অকার্যকর, এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমস্যার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাতীয় কন্যাশিশু এ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অরডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিরোধে কাজ করা এবং হয়রানির শিকার হলে শিক্ষার্থীরা কী করবে সে ব্যাপারে বেশি বেশি প্রচার করা।
রিপোর্টারের নাম 
























