বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘প্রাণভোমরা’ হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) আজ এক ক্রান্তিকাল পার করছে। দেশের মোট শিল্প কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ যোগানদাতা এই খাতটি বর্তমানে উচ্চ সুদের হার এবং অর্থায়ন সংকটে পিষ্ট। এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের কাছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রাণের দাবি—এসএমই ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হোক।
এসএমই খাতের বর্তমান চিত্র ও গুরুত্ব
- কর্মসংস্থান: দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে সরাসরি ৩ কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
- জিডিপিতে অবদান: জাতীয় অর্থনীতির (জিডিপি) প্রায় ৩০-৩২ শতাংশ আসে এই খাত থেকে।
- সুদের হারের চাপ: বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে এসএমই ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঠেকেছে, যা ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব।
- ঋণ বৈষম্য: নির্দেশ অনুযায়ী মোট ঋণের ২৫ শতাংশ এসএমই খাতে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ১৮ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতগুলো আরও বেশি অবহেলিত।
সংকটের মূল কারণসমূহ
১. উচ্চ সুদহার: ২০২২ সাল থেকে সুদহার বাজারভিত্তিক করার ফলে এবং ডলারের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে।
২. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট: শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলছে।
৩. ঋণ বিতরণে অনীহা: ঝুঁকি বেশি—এই অজুহাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে।
৪. মুদ্রাস্ফীতি: অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এবং কাঁচামালের দাম বাড়ায় নগদ প্রবাহ (Cash Flow) ব্যাহত হচ্ছে।
উত্তরণে সরকারের করণীয়: ৫টি সুপারিশ
- সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার: প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রধান দাবি হলো সুদের হার ৯ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনা। এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করতে পারে।
- ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম: ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি কমাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে গ্যারান্টি স্কিম চালু করতে পারে, যাতে জামানত ছাড়াই ছোট উদ্যোক্তারা ঋণ পান।
- কর ও ভ্যাট ছাড়: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার স্বার্থে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ট্যাক্স রিবেট বা বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা প্রয়োজন।
- জ্বালানি নিরাপত্তা: ক্ষুদ্র শিল্প এলাকাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
- বাজার সম্প্রসারণ: সরকারি কেনাকাটায় দেশীয় এসএমই পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা।
এসএমই খাত বাঁচলে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের কর্মসংস্থান বাঁচবে। অর্থমন্ত্রী নিজে একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এই যন্ত্রণা তিনি অনুধাবন করবেন বলে আমরা আশাবাদী। ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামানো কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।
রিপোর্টারের নাম 

























