ঢাকা ০৬:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল: নড়বড়ে লাইনেই ঝুঁকি নিয়ে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল। তবে এই উৎসবের আমেজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নড়বড়ে বাস্তবতার ছবি। ১৯৩০ সালে নির্মিত এই অঞ্চলের অনেক রেলপথ এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কোথাও লাইন দেবে যাচ্ছে, কোথাও নাট-বোল্ট নেই, আবার কোথাও স্লিপার ভাঙা—এমন ঝুঁকি নিয়েই শুরু হতে যাচ্ছে এবারের ঈদযাত্রা। কিন্তু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যাত্রীদের স্বস্তি দিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার দাবি করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে, সংস্কার ও মেরামতের কাজ চলছে পুরোদমে। বিশেষ করে রাজশাহী-জয়দেবপুর প্রকৌশলী বিভাগের আওতাধীন রেলপথগুলোতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ২৫৮/১ থেকে ২৫৯/০ কিলোমিটার অংশে, যেখানে এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ৫৯টি জয়েন্টে প্রয়োজনীয় ২৩৬টি নাট-বোল্টের বিপরীতে আছে মাত্র ১৮৯টি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ট্রেন যাওয়ার সময় লাইন প্রচণ্ডভাবে কাঁপে এবং বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়। রেলকর্মীরা বলছেন, জনবসতি এলাকায় নাট-বোল্ট চুরির কারণেই এই সংকটের সৃষ্টি। গত এক বছরে প্রায় ২৫০টি স্থানে লাইন ভাঙার ঘটনা ট্রেনের গতি কমিয়ে দিয়েছে এবং লাইনচ্যুতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

এই নড়বড়ে অবকাঠামো মেনেই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে বিশেষ ট্রেন সার্ভিস। এবারের ঈদে ‘পার্বতীপুর স্পেশাল’ ও ‘জয়দেবপুর স্পেশাল’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন জয়দেবপুর থেকে পার্বতীপুর রুটে চলাচল করবে। প্রতিটি ট্রেনে ৭৮৬টি আসন থাকবে এবং যাত্রাপথে চাটমোহর, ঈশ্বরদী বাইপাস, নাটোরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে। তবে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসীর জন্য আলাদা কোনো বিশেষ ট্রেন না থাকায় কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে। যদিও রেলওয়ে জানিয়েছে, যাত্রীচাপ সামলাতে ১৭ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ বা বগি সংযোজন করা হবে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানিয়েছেন, ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে প্রতিদিন ১২০টি ট্রেন চলাচল করে। পুরনো রেললাইন সংস্কারে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে যাতে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হয়। এবারের ঈদে প্রায় ৫৫ হাজার যাত্রী আসনে বসে এবং সাড়ে ১৩ হাজার যাত্রী দাঁড়িয়ে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশনের প্রবেশমুখে অতিরিক্ত আনসার সদস্য এবং ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে কাজ করবে প্রশাসন। এছাড়া ট্রেনের ভেতরে পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে বিশেষ চেকিং দল মোতায়েন থাকবে।

রেল কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, ঈদের আগেই রেলপথ সংস্কার এবং কোচ মেরামতের কাজ শেষ হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য কেবল জোড়াতালি দিয়ে মেরামত নয়, বরং এই ব্রিটিশ আমলের রেলপথের আধুনিকায়ন জরুরি। শেষ পর্যন্ত এই নড়বড়ে পথে যাত্রীদের ঈদযাত্রা কতটা স্বস্তির হয়, তা নির্ভর করছে চলমান সংস্কার কাজের গুণগত মান এবং রেলওয়ের কঠোর নজরদারির ওপর।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইরানকে দমানোর সক্ষমতা নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র’

রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল: নড়বড়ে লাইনেই ঝুঁকি নিয়ে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি

আপডেট সময় : ১০:৪০:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল। তবে এই উৎসবের আমেজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নড়বড়ে বাস্তবতার ছবি। ১৯৩০ সালে নির্মিত এই অঞ্চলের অনেক রেলপথ এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কোথাও লাইন দেবে যাচ্ছে, কোথাও নাট-বোল্ট নেই, আবার কোথাও স্লিপার ভাঙা—এমন ঝুঁকি নিয়েই শুরু হতে যাচ্ছে এবারের ঈদযাত্রা। কিন্তু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যাত্রীদের স্বস্তি দিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার দাবি করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে, সংস্কার ও মেরামতের কাজ চলছে পুরোদমে। বিশেষ করে রাজশাহী-জয়দেবপুর প্রকৌশলী বিভাগের আওতাধীন রেলপথগুলোতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ২৫৮/১ থেকে ২৫৯/০ কিলোমিটার অংশে, যেখানে এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ৫৯টি জয়েন্টে প্রয়োজনীয় ২৩৬টি নাট-বোল্টের বিপরীতে আছে মাত্র ১৮৯টি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ট্রেন যাওয়ার সময় লাইন প্রচণ্ডভাবে কাঁপে এবং বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়। রেলকর্মীরা বলছেন, জনবসতি এলাকায় নাট-বোল্ট চুরির কারণেই এই সংকটের সৃষ্টি। গত এক বছরে প্রায় ২৫০টি স্থানে লাইন ভাঙার ঘটনা ট্রেনের গতি কমিয়ে দিয়েছে এবং লাইনচ্যুতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

এই নড়বড়ে অবকাঠামো মেনেই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে বিশেষ ট্রেন সার্ভিস। এবারের ঈদে ‘পার্বতীপুর স্পেশাল’ ও ‘জয়দেবপুর স্পেশাল’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন জয়দেবপুর থেকে পার্বতীপুর রুটে চলাচল করবে। প্রতিটি ট্রেনে ৭৮৬টি আসন থাকবে এবং যাত্রাপথে চাটমোহর, ঈশ্বরদী বাইপাস, নাটোরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে। তবে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসীর জন্য আলাদা কোনো বিশেষ ট্রেন না থাকায় কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে। যদিও রেলওয়ে জানিয়েছে, যাত্রীচাপ সামলাতে ১৭ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ বা বগি সংযোজন করা হবে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানিয়েছেন, ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে প্রতিদিন ১২০টি ট্রেন চলাচল করে। পুরনো রেললাইন সংস্কারে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে যাতে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হয়। এবারের ঈদে প্রায় ৫৫ হাজার যাত্রী আসনে বসে এবং সাড়ে ১৩ হাজার যাত্রী দাঁড়িয়ে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশনের প্রবেশমুখে অতিরিক্ত আনসার সদস্য এবং ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে কাজ করবে প্রশাসন। এছাড়া ট্রেনের ভেতরে পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে বিশেষ চেকিং দল মোতায়েন থাকবে।

রেল কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, ঈদের আগেই রেলপথ সংস্কার এবং কোচ মেরামতের কাজ শেষ হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য কেবল জোড়াতালি দিয়ে মেরামত নয়, বরং এই ব্রিটিশ আমলের রেলপথের আধুনিকায়ন জরুরি। শেষ পর্যন্ত এই নড়বড়ে পথে যাত্রীদের ঈদযাত্রা কতটা স্বস্তির হয়, তা নির্ভর করছে চলমান সংস্কার কাজের গুণগত মান এবং রেলওয়ের কঠোর নজরদারির ওপর।