দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুদক আইন ও বিধি অনুযায়ী একটি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও, একই কর্মকর্তার হাতে একসঙ্গে একাধিক অভিযোগের দায়িত্ব থাকলে সময় গণনা কীভাবে হবে—তা বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ফলস্বরূপ, যেসব কর্মকর্তার দায়িত্বে দেড় থেকে দুই ডজন পর্যন্ত অভিযোগ অনুসন্ধানের ভার রয়েছে, তাদের পক্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি, অনেক কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো মামলায় সাক্ষ্য দিতে নিয়মিত যাতায়াত করতে হচ্ছে। এসব কারণে অনুসন্ধানে বিলম্ব ঘটলেও ‘সময়ক্ষেপণ’-এর অভিযোগে বদলি, সতর্কতা বা সাময়িক বরখাস্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে কমিশনের অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। অনেকের মতে, পর্যাপ্ত সময় ও জনবল না দিয়ে এমন কঠোরতা বাস্তবসম্মত নয়।
দুদকের একাধিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত সারা দেশের বিচারিক আদালতগুলোতে দুদকের ২ হাজার ৮৬৬টি মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে আরও ২৪০টি মামলা। এ ছাড়া, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে রিট, আপিল ও রিভিশনসহ বিচারাধীন মামলার মোট সংখ্যা হলো ৪ হাজার ৫২১টি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময়ে দুদকে ১৬ হাজার ৩২৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮২৭টি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় এবং ৭৬৮ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে কমিশন। এ ছাড়াও, দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগে অনুসন্ধান, মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান। ফলে, দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তারা এসব মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই চাপ আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে সময়মতো প্রয়োজনীয় নথিপত্র না পাওয়া, সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য বিভিন্ন স্থানে যাওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতাসহ সব মিলিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটছে। এর মধ্যে, নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল না করার অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও ভয় কাজ করছে। গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই দুদকের ছয় জন কর্মকর্তাকে নানা অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের কেউই বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, এভাবে ব্যবস্থা নিতে থাকলে কর্মকর্তাদের ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়বে এবং কাজের গতি উল্টো কমে যাবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডেপুটি টাউন প্ল্যানার কামরুল হাসান সোহাগসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে রূপায়ণ হাউজিংকে প্ল্যান পাস করে দেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান দুদকের উপ-পরিচালক মো. আহসানুল কবীর পলাশ। নির্ধারিত সময়সীমা (২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল) পার হওয়ার পরও কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দপ্তরে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা না দেওয়া এবং সময় বৃদ্ধির আবেদন না করার অভিযোগে গত ৬ আগস্ট তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে আবদুল মোমেনের কমিশন। একই ধরনের অভিযোগে গত ১৭ জুলাই দুদকের উপ-পরিচালক কমলেশ মন্ডলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ঢাকা ওয়াসার একটি প্রকল্পের পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আখতারুজ্জামানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে লোকবল নিয়োগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করে দুর্নীতি করা সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেননি এবং সময় বাড়ানোরও আবেদন করেননি। এ কারণে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই ধরনের অন্যান্য অভিযোগে আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
দুদকের সংশোধিত বিধিমালার গেজেট প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের ২০ জুন। ওই বিধিমালার বিধি-৭ এ বলা হয়েছে, অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে অনধিক ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান কাজ শেষ করে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। যদি যুক্তিসঙ্গত কারণে প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব না হয়, তবে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা কারণ উল্লেখ করে সময় চেয়ে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করবেন। আবেদন যথাযথ হলে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা কমিশনার ও মহাপরিচালককে লিখিতভাবে জানিয়ে অনধিক আরও ৩০ কার্যদিবস সময় বাড়াতে পারবেন। এরপরেও অনুসন্ধান কাজ শেষ না হলে বিষয়টি কমিশনে উপস্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কমিশন স্বীয় বিবেচনায় সময় বাড়াতে পারবে। কমিশনের যদি মনে হয় অনুসন্ধান কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিধি অনুসারে সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করা থেকে বিরত থাকছেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
বিধিমালায় একটি অনুসন্ধানের সময়সীমা দেওয়া থাকলেও, একসঙ্গে একাধিক অনুসন্ধান যদি একজন কর্মকর্তার হাতে থাকে, তাহলে কী হবে—সেটা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কিনা জানতে একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে তারা বলছেন, অনেক সময় দেখা যায় অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটির কার্যক্রম শুরু কিংবা মতামত দেওয়ার আগেই কমিশন থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটাকে তারা অন্যায় বলে মনে করেন। যদিও তারা এ কথাও স্বীকার করেন যে, কেউ কেউ যে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কালক্ষেপণ করছেন না—সেটা বলা যাবে না।
এসব বিষয়ে দুদকের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনুসন্ধানের সময়সীমার বিষয়ে বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে। এর বাইরেও যদি যৌক্তিক সময়ের প্রয়োজন হয়, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া যেমন জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরও কাজের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা থাকতে হবে।’
রিপোর্টারের নাম 
























