ঢাকা ১২:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

গলা ব্যথায় অবহেলা নয়: রিউম্যাটিক জ্বর থেকে হৃদরোগের ঝুঁকি

বাংলাদেশে এখনো শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রিউম্যাটিক জ্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সাধারণ গলাব্যথা বা টনসিলের সংক্রমণকে আমরা অনেক সময় তুচ্ছ মনে করি। কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা না হলে এই সংক্রমণ থেকেই হতে পারে রিউম্যাটিক জ্বর, যা পরে স্থায়ী হৃদরোগে (রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ) রূপ নিতে পারে।

গ্রুপ ‘এ’ বিটা-হেমোলাইটিক স্ট্রেপটোকক্কাস নামের জীবাণু গলায় সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের দু-তিন সপ্তাহ পর শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে নিজেরই হৃদপিণ্ড, জয়েন্ট, ত্বক বা স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। এই অবস্থাকেই রিউম্যাটিক জ্বর বলা হয়।

রিউম্যাটিক জ্বরের লক্ষণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: এক জয়েন্ট থেকে অন্য জয়েন্টে ঘুরে বেড়ানো ব্যথা ও ফোলা, জ্বর, বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট (কার্ডাইটিস হলে) এবং অস্বাভাবিক হাত-পা নড়া (কোরিয়া)। এই রোগের সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতা হলো হৃদপিণ্ডের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, যা আজীবন সমস্যা তৈরি করতে পারে।

রিউম্যাটিক জ্বরের চিকিৎসার মূল ভিত্তি তিনটি। প্রথমত, জীবাণু নির্মূল করা। রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ইনজেকশন বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন জি একবার গভীর পেশিতে দিতে হয়। ২৭ কেজির কম ওজন হলে ৬ লাখ ইউনিট এবং ২৭ কেজির বেশি হলে ১২ লাখ ইউনিট। সাধারণত একবারের ইনজেকশনই যথেষ্ট। পেনিসিলিনে অ্যালার্জি থাকলে বিকল্প অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রদাহ কমানো। জয়েন্টের ব্যথা থাকলে উচ্চমাত্রার অ্যাসপিরিন দেওয়া হয়। হৃদযন্ত্রে প্রদাহ বা হার্ট ফেইলিউর থাকলে কর্টিকোস্টেরয়েড প্রয়োজন হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপসর্গ দ্রুত কমে যায়।

তৃতীয়ত, পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ। রিউম্যাটিক জ্বর একবার হলে আবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতি তিন-চার সপ্তাহ অন্তর বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন ইনজেকশন নিতে হয়। কার্ডাইটিস না থাকলে কমপক্ষে ৫ বছর বা ২১ বছর বয়স পর্যন্ত, কার্ডাইটিস থাকলে ১০ বছর বা তার বেশি এবং ভালভের স্থায়ী ক্ষতি থাকলে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত, কখনো আজীবন এই ইনজেকশন চালিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশে অনেক সময় প্রতি তিন সপ্তাহে ইনজেকশন দেওয়া উত্তম।

আমাদের দেশে এখনো অনেক শিশু অপচিকিৎসা বা চিকিৎসাহীন গলাব্যথার কারণে পরে হার্টের ভালভ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। অথচ সময়মতো সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক নিলে এই রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ হলো: শিশুর গলাব্যথা দু-তিন দিনের বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করবেন না এবং রিউম্যাটিক জ্বর হলে নিয়মিত প্রফাইল্যাক্সিস ইনজেকশন নিশ্চিত করুন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গর্ভাবস্থায় রোজা: মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ

গলা ব্যথায় অবহেলা নয়: রিউম্যাটিক জ্বর থেকে হৃদরোগের ঝুঁকি

আপডেট সময় : ১০:৩৬:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশে এখনো শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রিউম্যাটিক জ্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সাধারণ গলাব্যথা বা টনসিলের সংক্রমণকে আমরা অনেক সময় তুচ্ছ মনে করি। কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা না হলে এই সংক্রমণ থেকেই হতে পারে রিউম্যাটিক জ্বর, যা পরে স্থায়ী হৃদরোগে (রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ) রূপ নিতে পারে।

গ্রুপ ‘এ’ বিটা-হেমোলাইটিক স্ট্রেপটোকক্কাস নামের জীবাণু গলায় সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের দু-তিন সপ্তাহ পর শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে নিজেরই হৃদপিণ্ড, জয়েন্ট, ত্বক বা স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। এই অবস্থাকেই রিউম্যাটিক জ্বর বলা হয়।

রিউম্যাটিক জ্বরের লক্ষণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: এক জয়েন্ট থেকে অন্য জয়েন্টে ঘুরে বেড়ানো ব্যথা ও ফোলা, জ্বর, বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট (কার্ডাইটিস হলে) এবং অস্বাভাবিক হাত-পা নড়া (কোরিয়া)। এই রোগের সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতা হলো হৃদপিণ্ডের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, যা আজীবন সমস্যা তৈরি করতে পারে।

রিউম্যাটিক জ্বরের চিকিৎসার মূল ভিত্তি তিনটি। প্রথমত, জীবাণু নির্মূল করা। রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ইনজেকশন বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন জি একবার গভীর পেশিতে দিতে হয়। ২৭ কেজির কম ওজন হলে ৬ লাখ ইউনিট এবং ২৭ কেজির বেশি হলে ১২ লাখ ইউনিট। সাধারণত একবারের ইনজেকশনই যথেষ্ট। পেনিসিলিনে অ্যালার্জি থাকলে বিকল্প অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রদাহ কমানো। জয়েন্টের ব্যথা থাকলে উচ্চমাত্রার অ্যাসপিরিন দেওয়া হয়। হৃদযন্ত্রে প্রদাহ বা হার্ট ফেইলিউর থাকলে কর্টিকোস্টেরয়েড প্রয়োজন হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপসর্গ দ্রুত কমে যায়।

তৃতীয়ত, পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ। রিউম্যাটিক জ্বর একবার হলে আবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতি তিন-চার সপ্তাহ অন্তর বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন ইনজেকশন নিতে হয়। কার্ডাইটিস না থাকলে কমপক্ষে ৫ বছর বা ২১ বছর বয়স পর্যন্ত, কার্ডাইটিস থাকলে ১০ বছর বা তার বেশি এবং ভালভের স্থায়ী ক্ষতি থাকলে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত, কখনো আজীবন এই ইনজেকশন চালিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশে অনেক সময় প্রতি তিন সপ্তাহে ইনজেকশন দেওয়া উত্তম।

আমাদের দেশে এখনো অনেক শিশু অপচিকিৎসা বা চিকিৎসাহীন গলাব্যথার কারণে পরে হার্টের ভালভ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। অথচ সময়মতো সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক নিলে এই রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ হলো: শিশুর গলাব্যথা দু-তিন দিনের বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করবেন না এবং রিউম্যাটিক জ্বর হলে নিয়মিত প্রফাইল্যাক্সিস ইনজেকশন নিশ্চিত করুন।