পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় জনস্রোত ঢাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লাখো মানুষ নাড়ির টানে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। তবে এবারের ঈদযাত্রাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক দুশ্চিন্তা। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং এর প্রভাবে যাতায়াত খরচ বাড়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দকে কিছুটা ম্লান করে দিচ্ছে।
যাত্রী, পরিবহন মালিক এবং বাজার পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া এক ধরনের মানসিক ভীতি এবং ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের উপচে পড়া চাপ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে পরিবহন খাতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, তবুও মাঠপর্যায়ে ভাড়া নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকার তেজগাঁও, মিরপুর ও মগবাজার এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে। রাইড-শেয়ারিং চালক থেকে শুরু করে দূরপাল্লার বাস চালক—সবার মধ্যেই একটি সাধারণ উদ্বেগ কাজ করছে। তাঁদের মতে, জ্বালানি সংগ্রহে সময় বেশি লাগলে বা দাম বাড়লে সেটি সরাসরি তাঁদের আয় ও ভাড়ার ওপর প্রভাব ফেলবে।
পরিবহন মালিকরা বলছেন, দূরপাল্লার রুটে বাসের পরিচালন ব্যয়ের সিংহভাগই যায় জ্বালানি খাতে। বর্তমানে তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কিছুটা ধীরগতির মনে হওয়ায় বাসমালিকরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, যদি একটি গন্তব্যে পৌঁছাতে বাসকে একাধিক পাম্পে অপেক্ষা করতে হয়, তবে সময়মতো যাত্রী পরিবহন করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং যাতায়াত খরচও বেড়ে যাবে। অন্যদিকে, সাধারণ যাত্রীরা চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আগত যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতি বছরই ঈদের সময় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। এবার যদি জ্বালানির অজুহাত সামনে আসে, তবে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়ি ফেরা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, জ্বালানি বাজারের এই পরিস্থিতিকে কিছু অসাধু পরিবহন মালিক ভাড়া বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন ভাড়ার ওপর কঠোর নজরদারি এবং ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
তবে জনমনে ছড়িয়ে পড়া এই উদ্বেগের বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি ও পর্যাপ্ত মজুতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আপাতত জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। মঙ্গলবার সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই; পেট্রোল পাম্পের ভিড় মূলত মানুষের আতঙ্কের কারণে তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও জানান, পেট্রোল ও অকটেনের বেশিরভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের বড় চালানও ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। ৩০ হাজার টন জ্বালানি নিয়ে আসা একটি জাহাজ খালাস কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ১২ মার্চ আরও একটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে পাইপলাইন চুক্তির আওতায় নিয়মিত জ্বালানি আসছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে নৌপরিবহন ও সড়ক পরিবহন বিভাগ থেকেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নৌপরিবহন সচিব ড. নূরুন নাহার চৌধুরী জানিয়েছেন, সদরঘাটের চাপ কমাতে বিকল্প টার্মিনাল যেমন শিমুলিয়া ও বসিলা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সড়ক পরিবহন সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হকও মহাসড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর নজরদারির আশ্বাস দিয়েছেন। সব মিলিয়ে সরকারি নিশ্চয়তা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ঈদযাত্রা কতটা স্বস্তিদায়ক হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
রিপোর্টারের নাম 























