ঢাকা ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

বকেয়া বিল নিয়ে বৈঠক ব্যর্থ: গরমে বিদ্যুৎ সংকটের তীব্র শঙ্কা

জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং আসন্ন গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ—এই দুই সাঁড়াশী চাপের মুখে দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন গভীর অনিশ্চয়তার আবর্তে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকদের পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। সময়মতো এই অর্থ পরিশোধ না হলে জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হবে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এমন আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে বৈঠক করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন’ (বিআইপিপিএ)। তবে দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষ থেকে চরম আর্থিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিআইপিপিএ নেতারা জানান, বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া থাকায় ব্যাংকগুলো নতুন করে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে বা ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এর ফলে নতুন করে জ্বালানি তেল আমদানি করা অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, আসন্ন ঈদের ছুটির আগেই যেন অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। কারণ, বিদেশ থেকে তেল আমদানিতে কমপক্ষে ৪০ দিন সময় লাগে; ফলে এখনই ঋণপত্র খোলা না গেলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অধিকাংশ কেন্দ্র জ্বালানিহীন হয়ে পড়বে।

বিআইপিপিএর সাবেক সভাপতি ইমরান করিম এক আশঙ্কাজনক তথ্য দিয়ে জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব হতে পারে। তবে দেশের সব এলাকায় মজুত সমান না হওয়ায় অনেক জায়গায় এর আগেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৪৯ শতাংশই সরবরাহ করে এই বেসরকারি কেন্দ্রগুলো। ফলে এই খাতে অচলাবস্থা তৈরি হলে পুরো জাতীয় গ্রিডেই বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

সংকটের আরেকটি দিক হলো বিপিডিবি ও বেসরকারি মালিকদের মধ্যকার জরিমানা সংক্রান্ত বিরোধ। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় কেন্দ্রগুলোর ওপর কয়েক হাজার কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিপরীতে উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকার বিল পরিশোধ না করায় তারা তেল কিনতে পারেননি, যা তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। বিআইপিপিএ সভাপতি কে এম রেজাউল হাসানাত বলেন, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিল পরিশোধ করা হলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের আট থেকে দশ মাসের বিল আটকে আছে, যা কাম্য নয়।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বৈঠকে উদ্যোক্তাদের সমস্যার কথা ধৈর্যসহকারে শোনেন এবং বিষয়টি সমাধানে কিছুটা সময় চেয়েছেন। তিনি দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার আশ্বাস দিয়ে বলেন, যেকোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে এবং এটি আদালত পর্যন্ত গড়ানো উচিত নয়। এর আগে ৯ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বিআইপিপিএ নেতারা বিকল্প হিসেবে ‘বন্ড’-এর মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রীষ্মের পিক সিজন শুরু হওয়ার আগে যদি দ্রুত এই আর্থিক জটিলতা নিরসন না হয়, তবে শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

চ্যাম্পিয়নস লিগে লিভারপুলের হোঁচট: স্লটের শততম ম্যাচে হার, পিছিয়ে অলরেডরা

বকেয়া বিল নিয়ে বৈঠক ব্যর্থ: গরমে বিদ্যুৎ সংকটের তীব্র শঙ্কা

আপডেট সময় : ০৯:৩৪:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং আসন্ন গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ—এই দুই সাঁড়াশী চাপের মুখে দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন গভীর অনিশ্চয়তার আবর্তে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকদের পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। সময়মতো এই অর্থ পরিশোধ না হলে জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হবে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এমন আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে বৈঠক করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন’ (বিআইপিপিএ)। তবে দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষ থেকে চরম আর্থিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিআইপিপিএ নেতারা জানান, বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া থাকায় ব্যাংকগুলো নতুন করে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে বা ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এর ফলে নতুন করে জ্বালানি তেল আমদানি করা অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, আসন্ন ঈদের ছুটির আগেই যেন অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। কারণ, বিদেশ থেকে তেল আমদানিতে কমপক্ষে ৪০ দিন সময় লাগে; ফলে এখনই ঋণপত্র খোলা না গেলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অধিকাংশ কেন্দ্র জ্বালানিহীন হয়ে পড়বে।

বিআইপিপিএর সাবেক সভাপতি ইমরান করিম এক আশঙ্কাজনক তথ্য দিয়ে জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব হতে পারে। তবে দেশের সব এলাকায় মজুত সমান না হওয়ায় অনেক জায়গায় এর আগেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৪৯ শতাংশই সরবরাহ করে এই বেসরকারি কেন্দ্রগুলো। ফলে এই খাতে অচলাবস্থা তৈরি হলে পুরো জাতীয় গ্রিডেই বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

সংকটের আরেকটি দিক হলো বিপিডিবি ও বেসরকারি মালিকদের মধ্যকার জরিমানা সংক্রান্ত বিরোধ। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় কেন্দ্রগুলোর ওপর কয়েক হাজার কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিপরীতে উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকার বিল পরিশোধ না করায় তারা তেল কিনতে পারেননি, যা তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। বিআইপিপিএ সভাপতি কে এম রেজাউল হাসানাত বলেন, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিল পরিশোধ করা হলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের আট থেকে দশ মাসের বিল আটকে আছে, যা কাম্য নয়।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বৈঠকে উদ্যোক্তাদের সমস্যার কথা ধৈর্যসহকারে শোনেন এবং বিষয়টি সমাধানে কিছুটা সময় চেয়েছেন। তিনি দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার আশ্বাস দিয়ে বলেন, যেকোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে এবং এটি আদালত পর্যন্ত গড়ানো উচিত নয়। এর আগে ৯ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বিআইপিপিএ নেতারা বিকল্প হিসেবে ‘বন্ড’-এর মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রীষ্মের পিক সিজন শুরু হওয়ার আগে যদি দ্রুত এই আর্থিক জটিলতা নিরসন না হয়, তবে শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হতে পারে।