ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি একের পর এক ব্যতিক্রমী ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারেও তাঁর নিয়মিত অফিস করা। যদিও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো দপ্তরের জন্য শনিবার কাজ বাধ্যতামূলক করার আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, তবুও প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগকে ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে—তবে কি আবারও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল হতে যাচ্ছে?
বিশেষ করে বিএনপির পূর্ববর্তী শাসনামলে (২০০১-২০০৬) শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি না থাকার নজির থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আলোচনা আরও ডালপালা মেলেছে। অনেকের ধারণা, নতুন সরকার চাইলে সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসের পরিবর্তে আবারও ছয় কর্মদিবসের প্রথা ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে প্রশাসন ও সংস্থাপন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই সম্ভাবনাকে আপাতত খুব একটা বাস্তবসম্মত মনে করছেন না। তাঁদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে সাপ্তাহিক ছুটি কমিয়ে এক দিন করা সরকারের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে। বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদি দুই দিনের পরিবর্তে এক দিন সাপ্তাহিক ছুটি করা হয়, তবে সরকারি অফিস-আদালত পরিচালনায় বিদ্যুৎ এবং যানবাহনের জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। সম্প্রতি দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির অবনতির কারণে সব বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই ইঙ্গিত করে।
প্রশাসনের সাবেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সীমিত পরিসরে শুক্র ও শনিবার—এই দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি প্রবর্তন করা হয়েছিল। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার এই প্রসঙ্গে বলেন, অফিসে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো এবং সরকারি যানবাহনের জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যেই তখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও যদি ছুটি কমিয়ে এক দিন করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি হলেও ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে শনি ও রবিবার ছুটি পালন করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেক সময় তিন দিনের একটি দীর্ঘ কর্মবিরতির জটিলতা তৈরি হয়। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম কবীর জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের সাপ্তাহিক ছুটির এই অমিল অনেক সময় পণ্য খালাস ও এলসি সংক্রান্ত কাজে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু শনিবারের ছুটি বাতিল করলেই এই সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না, কারণ মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই এখন শনি ও রবিবার ছুটির প্রচলন রয়েছে।
বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটির ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি পালিত হতো। ১৯৮৩ সালে প্রথমবারের মতো শুক্র ও শনিবার—এই দুই দিনের ছুটি চালু হয়, যা ১৯৮৫ সালে আবারও কমিয়ে শুধু শুক্রবারে আনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দুই দিনের ছুটি ফিরিয়ে আনলেও ২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার তা বাতিল করে কেবল শুক্রবার ছুটি বহাল রাখে। সবশেষ ২০০৭ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত আবারও দুই দিনের ছুটির ব্যবস্থা চলে আসছে। এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কর্মতৎপরতা দেশের প্রশাসনিক ক্যালেন্ডারে নতুন কোনো পরিবর্তন আনে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো দেশ।
রিপোর্টারের নাম 























