দেশে গণপরিবহনে যাতায়াতে ৮৭ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিকসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন, যার মধ্যে ৩৬ শতাংশ হয় যৌন হয়রানির শিকার। এসব তথ্য চলতি বছরের এপ্রিলে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ইউএন উইমেন্স এবং সুইডেন দূতাবাসের সহযোগিতায় আয়োজিত একটি ক্যাম্পেইনে প্রকাশিত হয়। গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হলে কীভাবে আইনি সহায়তা পেতে পারেন, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইফফাত আরা গিয়াস কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।
গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হলে প্রথমে যা করতে হবে
প্রথম কাজ হবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যত দ্রুত সম্ভব ভিড় থেকে দূরে চলে যান, চিৎকার করে আশপাশের লোকদের সচেতন করুন এবং যদি সরাসরি বিপদাপন্ন মনে হয়, তাহলে চালক, কন্ডাক্টর অথবা শুভানুধ্যায়ীর সাহায্য চান। একে অপরের সাহায্যে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা জরুরি। এছাড়া, ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করুন, ছবি তুলুন এবং পাশে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের নাম ও মোবাইল নম্বর নোট করে রাখুন, যা পরবর্তীতে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।
আইনগত দিক
গণপরিবহনে শারীরিক ভঙ্গি, ছোঁয়া কিংবা আপত্তিকর আচরণ পেনাল কোডের ধার্য শাস্তিযোগ্য অপরাধের মধ্যে পড়ে। কোনো ব্যক্তি যদি নারীর শালীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে তাকে আক্রমণ করে বা অপরাধমূলক বল প্রয়োগ করে, সেটি ধারা ৩৫৪-এর মধ্যে পড়ে। এছাড়া, নারীর শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে কোনো শব্দ ব্যবহার, অঙ্গভঙ্গি কিংবা কোনো কাজ করলে তা ধারা ৫০৯ অনুসারে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধগুলোর ভিত্তিতে মামলা করা যায়। দেশের সংবিধান নাগরিকদের সমতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করেছে, যা নারীদের পুরুষের সঙ্গে সমান অধিকার প্রদান করে।
আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে কীভাবে
ঘটনার পর দ্রুত নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অথবা গুরুতর হলে এফআইআর/মোকদ্দমা করুন। এছাড়া, অনলাইন জিডি সার্ভিসও রয়েছে, যেখানে প্রাথমিক অভিযোগ দাখিল করা যায়। পুলিশ আপনাকে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে সাহায্য করবে। মেডিকেল পরীক্ষার কাগজ এবং মোবাইল ফোনে করা ভিডিও বা অডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা মেসেজের স্ক্রিনশটও সংরক্ষণ করা জরুরি। প্রয়োজনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর অধীন কঠোর ধারাও বিবেচিত হতে পারে।
কটূক্তি বা মৌখিক হয়রানির শিকার হলে করণীয়
হয়রানির ঘটনা ঘটলে কড়া ভাষায় বিরক্তি জানান এবং আশপাশের মানুষকে ডাকা গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাটি রেকর্ড বা নোট করা প্রয়োজনীয়। সামাজিকভাবে মামলা বা অভিযোগ আনার সময় ভুক্তভোগীকে অপমান করার প্রবণতা থাকতে পারে, কিন্তু এখানে আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত কলঙ্ক বা সোশ্যাল মিডিয়ার চাপকে অতিরঞ্জিতভাবে গ্রহণ করবেন না। গবেষণা ও এনজিও সার্ভেতে দেখা গেছে, গণপরিবহনে কটূক্তি ব্যাপক, এবং তাই আইনি ও সামাজিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মানসিক সহায়তা ও সুরাহা
ন্যক্কারজনক কোনো ঘটনা ঘটলে পরিবার, বন্ধু, স্থানীয় নারী সাহায্য কেন্দ্র কিংবা আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রমাণ না করে দ্রুত সামাজিক মিডিয়ায় নেটিভ স্টোরি ছড়িয়ে দেওয়ার আগে আইনগত পরামর্শ নেয়া ভালো। সমাজে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ বন্ধ করতে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। নিন্দা নয়, সহায়তা বাড়ানোই সমাধান।
জীবিকার প্রয়োজনে নারীদের গণপরিবহনে চলাচল করতে হয়, কিন্তু যখন তারা হয়রানির শিকার হয়, তখন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হয়। এটি আইনের চোখে অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং আইনি সহায়তা নিতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























