ঢাকা ০৪:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

স্মৃতি কেড়ে নিচ্ছে যে নীরব ঘাতক: উচ্চ রক্তচাপ ও মস্তিষ্কের ঝুঁকি

উচ্চ রক্তচাপ, যা হাইপারটেনশন নামেও পরিচিত, সাধারণত হৃদরোগের প্রধান কারণ হিসেবেই বিবেচিত হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই নীরব ঘাতক কেবল হৃদপিণ্ড নয়, অলক্ষ্যে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্ষমতারও অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে চলেছে। দীর্ঘকাল ধরে কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারেন না যে, তাদের শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ— মস্তিষ্ক— ধীরে ধীরে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

মানবদেহের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশ হলেও, মস্তিষ্ক শরীরের মোট রক্ত ও অক্সিজেনের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করে। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে রক্তপ্রবাহে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটলেও মস্তিষ্কের কোষগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ধমনীগুলো শক্ত ও সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রক্ত জমাট বেঁধে বা অতিরিক্ত চাপে ধমনী ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি: স্মৃতিভ্রংশ ও ডিমেনশিয়া
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মধ্যবয়স থেকে যারা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, পরবর্তী জীবনে তাদের স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া এবং ‘ডিমেনশিয়া’ বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

হিপোক্যাম্পাসের সংকোচন: মস্তিষ্কের স্মৃতি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘হিপোক্যাম্পাস’ উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবে সংকুচিত হতে পারে, যা নতুন স্মৃতি ধারণ এবং পুরোনো স্মৃতি পুনরুদ্ধারে বাধা দেয়।
হোয়াইট ম্যাটারের ক্ষতি: মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী ‘হোয়াইট ম্যাটার’ বা সাদা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিকল্পনা গ্রহণ, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা হ্রাস পায়।
মিনি-স্ট্রোকের ঝুঁকি: অনেকে সাময়িক বা ‘মিনি-স্ট্রোক’ অনুভব করেন, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী হলেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের আগাম সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। এই ক্ষুদ্র স্ট্রোকগুলোও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মস্তিষ্ক ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গের ওপর প্রভাব
উচ্চ রক্তচাপ কেবল মস্তিষ্কের ক্ষতি করেই থেমে থাকে না, শরীরের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে আঘাত হানে:

কিডনি: কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর ছাঁকন ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদী এই ক্ষতি ক্রমান্বয়ে কিডনি বিকল করে দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ডায়ালাইসিসের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
চোখ: রেটিনার রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে, এমনকি অন্ধত্বও দেখা দিতে পারে।

সুরক্ষার উপায়: জীবনযাত্রায় পরিবর্তন জরুরি
বিশেষজ্ঞরা এই নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন:

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, প্রচুর ফলমূল, শাকসবজি এবং আস্ত দানা শস্য (Whole grains) গ্রহণ করা উচিত। প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার এড়িয়ে চলা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম: সপ্তাহে অন্তত আড়াই ঘণ্টা মাঝারি মানের ব্যায়াম, যেমন— দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইক্লিং— রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জাদুর মতো কাজ করে।
মানসিক প্রশান্তি: গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, যোগব্যায়াম বা মেডিটেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। মানসিক চাপ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ: বাড়িতে নিয়মিত রক্তচাপ মেপে দেখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা আবশ্যক। রক্তচাপ স্বাভাবিক মনে হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, সময় মতো সচেতনতাই পারে এই নীরব ঘাতকের বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করতে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তারেক রহমানের কারাবন্দি জীবনের দুই দশক: এক কঠিন যাত্রার স্মরণ

স্মৃতি কেড়ে নিচ্ছে যে নীরব ঘাতক: উচ্চ রক্তচাপ ও মস্তিষ্কের ঝুঁকি

আপডেট সময় : ০২:১০:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

উচ্চ রক্তচাপ, যা হাইপারটেনশন নামেও পরিচিত, সাধারণত হৃদরোগের প্রধান কারণ হিসেবেই বিবেচিত হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই নীরব ঘাতক কেবল হৃদপিণ্ড নয়, অলক্ষ্যে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্ষমতারও অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে চলেছে। দীর্ঘকাল ধরে কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারেন না যে, তাদের শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ— মস্তিষ্ক— ধীরে ধীরে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

মানবদেহের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশ হলেও, মস্তিষ্ক শরীরের মোট রক্ত ও অক্সিজেনের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করে। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে রক্তপ্রবাহে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটলেও মস্তিষ্কের কোষগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ধমনীগুলো শক্ত ও সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রক্ত জমাট বেঁধে বা অতিরিক্ত চাপে ধমনী ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি: স্মৃতিভ্রংশ ও ডিমেনশিয়া
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মধ্যবয়স থেকে যারা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, পরবর্তী জীবনে তাদের স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া এবং ‘ডিমেনশিয়া’ বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

হিপোক্যাম্পাসের সংকোচন: মস্তিষ্কের স্মৃতি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘হিপোক্যাম্পাস’ উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবে সংকুচিত হতে পারে, যা নতুন স্মৃতি ধারণ এবং পুরোনো স্মৃতি পুনরুদ্ধারে বাধা দেয়।
হোয়াইট ম্যাটারের ক্ষতি: মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী ‘হোয়াইট ম্যাটার’ বা সাদা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিকল্পনা গ্রহণ, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা হ্রাস পায়।
মিনি-স্ট্রোকের ঝুঁকি: অনেকে সাময়িক বা ‘মিনি-স্ট্রোক’ অনুভব করেন, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী হলেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের আগাম সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। এই ক্ষুদ্র স্ট্রোকগুলোও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মস্তিষ্ক ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গের ওপর প্রভাব
উচ্চ রক্তচাপ কেবল মস্তিষ্কের ক্ষতি করেই থেমে থাকে না, শরীরের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে আঘাত হানে:

কিডনি: কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর ছাঁকন ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদী এই ক্ষতি ক্রমান্বয়ে কিডনি বিকল করে দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ডায়ালাইসিসের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
চোখ: রেটিনার রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে, এমনকি অন্ধত্বও দেখা দিতে পারে।

সুরক্ষার উপায়: জীবনযাত্রায় পরিবর্তন জরুরি
বিশেষজ্ঞরা এই নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন:

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, প্রচুর ফলমূল, শাকসবজি এবং আস্ত দানা শস্য (Whole grains) গ্রহণ করা উচিত। প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার এড়িয়ে চলা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম: সপ্তাহে অন্তত আড়াই ঘণ্টা মাঝারি মানের ব্যায়াম, যেমন— দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইক্লিং— রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জাদুর মতো কাজ করে।
মানসিক প্রশান্তি: গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, যোগব্যায়াম বা মেডিটেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। মানসিক চাপ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ: বাড়িতে নিয়মিত রক্তচাপ মেপে দেখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা আবশ্যক। রক্তচাপ স্বাভাবিক মনে হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, সময় মতো সচেতনতাই পারে এই নীরব ঘাতকের বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করতে।