ঢাকা ০১:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

ঢামেক নার্সের করুণ মৃত্যু: চিরকুটে বেরিয়ে এলো স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পৈশাচিক নির্যাতনের চিত্র

রাজধানীর চাঁনখারপুলের একটি ভাড়া বাসা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সিনিয়র নার্স নাহিদা আক্তার ববির (২৯) নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে কক্ষের সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়নায় ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে আত্মহত্যা মনে করা হলেও, মৃত্যুর আগে নাহিদার লিখে যাওয়া তিনটি চিরকুটে ফুটে উঠেছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অমানুষিক ও পৈশাচিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা।

চিরকুটে ‘মরণোত্তর জবানবন্দি’:
মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া চিরকুটগুলোতে নাহিদা তার এই চরম পথ বেছে নেওয়ার জন্য স্বামী ইলিয়াস, শাশুড়ি, ননদ সুমি এবং স্বামীর পাতানো চাচা মো. শওকত হোসেনকে সরাসরি দায়ী করেছেন। অত্যন্ত আবেগঘন ও যন্ত্রণাকাতর ভাষায় তিনি লিখেছেন, স্বামী ও শওকত হোসেনের ধারাবাহিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তাকে প্রায়ই ‘কুকুরের মতো’ মারধর করা হতো বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। চিরকুটের এক স্থানে তিনি লিখেন, “সব সময় আমাকে বলতো তোর সাথে সংসার করতে চাই না।”

স্বামীর পরকীয়া ও সহযোগীদের ভূমিকা:
নাহিদার অভিযোগে তার স্বামী ইলিয়াসের চারিত্রিক স্খলনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইলিয়াস প্রায়ই বাইরে রাত কাটাতেন এবং দম্ভ করে বলতেন যে তিনি ‘একশ মেয়ের সাথে রাত কাটাতে পারেন’। অভিযোগ রয়েছে, ইলিয়াসের মা এবং বোন এই অনৈতিক কাজে তাকে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো উৎসাহ দিতেন এবং লোকমুখে প্রচার করতেন যে নাহিদার সাথে ইলিয়াসের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এছাড়া পাতানো চাচা শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ইলিয়াসকে বিভিন্ন নারীর কাছে নিয়ে যেতেন এবং প্রায়ই নাহিদাকে ফোনে ও সরাসরি অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দিতেন।

পুরানো ক্ষতের পুনরাবৃত্তি:
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে বিয়ের পর থেকেই নাহিদার ওপর নির্যাতনের সূত্রপাত হয়। ইতিপূর্বে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নির্যাতনের অভিযোগে নাহিদা মামলা করলে ইলিয়াসকে কারাবরণও করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে পারিবারিকভাবে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে তারা পুনরায় সংসার শুরু করলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। চিরকুটে নাহিদা জানিয়েছেন, ইলিয়াসের পরকীয়ার বহু প্রমাণ ও ছবি তিনি আলমারিতে রেখে গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি এই অন্যায়ের বিচার চেয়ে লিখে গেছেন, “আমি চাই তাদের উপযুক্ত শাস্তি হোক, যেন আর কোনো মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট না হয়।”

তদন্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি:
জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী ইলিয়াস পলাতক রয়েছেন। চকবাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. কাউছার জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত চিরকুটগুলো গুরুত্বের সাথে যাচাই করা হচ্ছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সিরাজগঞ্জ সদর রেলওয়ে কলোনির মেয়ে নাহিদার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের পরিবার এই ঘটনায় একটি ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ওয়াকফ সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ঢামেক নার্সের করুণ মৃত্যু: চিরকুটে বেরিয়ে এলো স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পৈশাচিক নির্যাতনের চিত্র

আপডেট সময় : ১১:৫৩:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

রাজধানীর চাঁনখারপুলের একটি ভাড়া বাসা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সিনিয়র নার্স নাহিদা আক্তার ববির (২৯) নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে কক্ষের সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়নায় ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে আত্মহত্যা মনে করা হলেও, মৃত্যুর আগে নাহিদার লিখে যাওয়া তিনটি চিরকুটে ফুটে উঠেছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অমানুষিক ও পৈশাচিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা।

চিরকুটে ‘মরণোত্তর জবানবন্দি’:
মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া চিরকুটগুলোতে নাহিদা তার এই চরম পথ বেছে নেওয়ার জন্য স্বামী ইলিয়াস, শাশুড়ি, ননদ সুমি এবং স্বামীর পাতানো চাচা মো. শওকত হোসেনকে সরাসরি দায়ী করেছেন। অত্যন্ত আবেগঘন ও যন্ত্রণাকাতর ভাষায় তিনি লিখেছেন, স্বামী ও শওকত হোসেনের ধারাবাহিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তাকে প্রায়ই ‘কুকুরের মতো’ মারধর করা হতো বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। চিরকুটের এক স্থানে তিনি লিখেন, “সব সময় আমাকে বলতো তোর সাথে সংসার করতে চাই না।”

স্বামীর পরকীয়া ও সহযোগীদের ভূমিকা:
নাহিদার অভিযোগে তার স্বামী ইলিয়াসের চারিত্রিক স্খলনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইলিয়াস প্রায়ই বাইরে রাত কাটাতেন এবং দম্ভ করে বলতেন যে তিনি ‘একশ মেয়ের সাথে রাত কাটাতে পারেন’। অভিযোগ রয়েছে, ইলিয়াসের মা এবং বোন এই অনৈতিক কাজে তাকে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো উৎসাহ দিতেন এবং লোকমুখে প্রচার করতেন যে নাহিদার সাথে ইলিয়াসের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এছাড়া পাতানো চাচা শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ইলিয়াসকে বিভিন্ন নারীর কাছে নিয়ে যেতেন এবং প্রায়ই নাহিদাকে ফোনে ও সরাসরি অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দিতেন।

পুরানো ক্ষতের পুনরাবৃত্তি:
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে বিয়ের পর থেকেই নাহিদার ওপর নির্যাতনের সূত্রপাত হয়। ইতিপূর্বে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নির্যাতনের অভিযোগে নাহিদা মামলা করলে ইলিয়াসকে কারাবরণও করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে পারিবারিকভাবে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে তারা পুনরায় সংসার শুরু করলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। চিরকুটে নাহিদা জানিয়েছেন, ইলিয়াসের পরকীয়ার বহু প্রমাণ ও ছবি তিনি আলমারিতে রেখে গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি এই অন্যায়ের বিচার চেয়ে লিখে গেছেন, “আমি চাই তাদের উপযুক্ত শাস্তি হোক, যেন আর কোনো মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট না হয়।”

তদন্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি:
জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী ইলিয়াস পলাতক রয়েছেন। চকবাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. কাউছার জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত চিরকুটগুলো গুরুত্বের সাথে যাচাই করা হচ্ছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সিরাজগঞ্জ সদর রেলওয়ে কলোনির মেয়ে নাহিদার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের পরিবার এই ঘটনায় একটি ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।