ঢাকা ০১:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

চাঁদাবাজি ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ: পল্লবীর সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পির বিরুদ্ধে সিআইডির মামলা

রাজধানীর মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি, জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাজুল (তাইজুল) ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পির বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অনুসন্ধান শেষে প্রায় আড়াই কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন ও পাচারের অভিযোগে এই মামলাটি করে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, তাজুল ইসলাম বাপ্পি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে পল্লবী এলাকায় পরিবহন খাত, ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা এবং পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত ৫ মার্চ পল্লবী থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এই মামলাটি দায়ের করা হয়, যেখানে বাপ্পি ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থার ভাষ্যমতে, তাজুল ইসলাম নিজেকে ‘স্মার্ট ফ্যাশন’ ও ‘মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড খান অটোব্রিক্স’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। গত এক দশকে (২০১৪-২০২৪) তিনি তার ব্যবসায়িক আয় ৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি বলে দাবি করলেও সিআইডির অনুসন্ধানে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য পাওয়া গেছে ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকার উপরে। অর্থাৎ, প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকারও বেশি সম্পদের কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতে পারেননি।

এছাড়া বাপ্পির মালিকানাধীন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ইটভাটাটি সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই ভাটার কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলেও সেখান থেকে তিনি প্রায় ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছেন, যা সিআইডির দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। এছাড়া সেনপাড়া এলাকায় জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকার জমি মাত্র ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় রেজিস্ট্রি করে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার উৎস গোপন করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে বাপ্পির বিরুদ্ধে ২ কোটি ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫১ টাকা অবৈধভাবে অর্জন ও স্থানান্তরের অভিযোগ এনেছে সিআইডি। অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে। বর্তমানে আদালতের নির্দেশে তার ব্যাংক হিসাবের একটি অংশ জব্দ রয়েছে।

তদন্তে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি উঠে এসেছে তা হলো জালিয়াতির মাধ্যমে অডিট রিপোর্ট তৈরি। বাপ্পির প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অডিট রিপোর্টে যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের স্বাক্ষর রয়েছে, তিনি করোনা মহামারির সময় মারা গেছেন। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির নাম ও পদবি ব্যবহার করে ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি করে তিনি আর্থিক অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।

সিআইডি জানিয়েছে, অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এই মামলার তদন্তের মাধ্যমে বাপ্পির অবৈধ সাম্রাজ্যের পেছনের আরও তথ্য এবং সহযোগীদের পরিচয় বের করে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ওয়াকফ সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

চাঁদাবাজি ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ: পল্লবীর সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পির বিরুদ্ধে সিআইডির মামলা

আপডেট সময় : ১১:৪৮:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

রাজধানীর মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি, জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাজুল (তাইজুল) ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পির বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অনুসন্ধান শেষে প্রায় আড়াই কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন ও পাচারের অভিযোগে এই মামলাটি করে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, তাজুল ইসলাম বাপ্পি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে পল্লবী এলাকায় পরিবহন খাত, ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা এবং পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত ৫ মার্চ পল্লবী থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এই মামলাটি দায়ের করা হয়, যেখানে বাপ্পি ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থার ভাষ্যমতে, তাজুল ইসলাম নিজেকে ‘স্মার্ট ফ্যাশন’ ও ‘মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড খান অটোব্রিক্স’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। গত এক দশকে (২০১৪-২০২৪) তিনি তার ব্যবসায়িক আয় ৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি বলে দাবি করলেও সিআইডির অনুসন্ধানে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য পাওয়া গেছে ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকার উপরে। অর্থাৎ, প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকারও বেশি সম্পদের কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতে পারেননি।

এছাড়া বাপ্পির মালিকানাধীন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ইটভাটাটি সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই ভাটার কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলেও সেখান থেকে তিনি প্রায় ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছেন, যা সিআইডির দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। এছাড়া সেনপাড়া এলাকায় জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকার জমি মাত্র ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় রেজিস্ট্রি করে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার উৎস গোপন করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে বাপ্পির বিরুদ্ধে ২ কোটি ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫১ টাকা অবৈধভাবে অর্জন ও স্থানান্তরের অভিযোগ এনেছে সিআইডি। অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে। বর্তমানে আদালতের নির্দেশে তার ব্যাংক হিসাবের একটি অংশ জব্দ রয়েছে।

তদন্তে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি উঠে এসেছে তা হলো জালিয়াতির মাধ্যমে অডিট রিপোর্ট তৈরি। বাপ্পির প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অডিট রিপোর্টে যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের স্বাক্ষর রয়েছে, তিনি করোনা মহামারির সময় মারা গেছেন। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির নাম ও পদবি ব্যবহার করে ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি করে তিনি আর্থিক অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।

সিআইডি জানিয়েছে, অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এই মামলার তদন্তের মাধ্যমে বাপ্পির অবৈধ সাম্রাজ্যের পেছনের আরও তথ্য এবং সহযোগীদের পরিচয় বের করে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।