## ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নাগরিক পার্টির একার লড়াই: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতেSo
ঢাকা: সদ্য সমাপ্ত হওয়া গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। যদিও অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের সুর লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তবে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ও পরে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিয়েছে। এই জটিল সময়ে, ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের প্রত্যাবর্তন প্রতিহত করতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কার্যত একাই মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দলটি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার।
গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ও এনসিপির উত্থান:
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। একইসঙ্গে দেশের ওপর ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রভাবও হ্রাস পায়। এই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি জাতীয় ঐক্যের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। তবে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসতেই সেই ঐক্য ফিকে হতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে, তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশের ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে একাকী লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছে। দলটির নেতারা দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, তারা এই লড়াইয়ে অবিচল থাকবেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি:
এনসিপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করছে। দলটি গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, তারা জুলাই শক্তির সম্মিলিত আন্দোলনের কথা ভাবছেন। ঈদুল ফিতরের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ঠেকানো, গণহত্যাসহ অন্যান্য অপরাধে জড়িত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিচার ত্বরান্বিত করা, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও উচ্চকক্ষ গঠন ইত্যাদি দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি আসতে পারে। এজন্য এনসিপি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং জুলাইয়ের পক্ষের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এনসিপির মূলনীতি ও অবস্থান:
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “দেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, যেখানে মানুষ স্লোগান তুলেছিল ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা।’” তিনি আরও বলেন, “এ দেশের মানুষ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যেমন বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, একইসঙ্গে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও স্লোগান তুলেছিল।” তিনি জোর দেন যে, গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্ব এনসিপি দলটি গঠন করেছে এবং মানুষের প্রত্যাশা মাথায় রেখেই তারা রাজনীতি করছে। তবে, তিনি একাওয়াই এই লড়াই সম্ভব নয় বলে মনে করেন, বরং “আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সবার যে ঐক্য, তা বজায় থাকলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।”
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ভারতীয় আধিপত্যবাদের গোপন নিঃশ্বাসও টের পাচ্ছি। এই দুই প্রশ্নে এনসিপি বরাবর অনমনীয় থেকেছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।” তিনি নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, “জনগণের ম্যান্ডেট তারা যেন ভুলে না যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় এনসিপি সব সময় সরব থাকবে।”
অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও এনসিপির স্বতন্ত্র অবস্থান:
দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে জুলাই গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনের দাবিতে এনসিপি যেভাবে সোচ্চার ছিল, সেভাবে বিএনপি ও জামায়াতকে দেখা যায়নি। এমনকি, এনসিপিসহ জুলাই শক্তিগুলো যখন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেছিল, তখন জামায়াত সমর্থন দিলেও বিএনপি বিপক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাচনের সময় ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে মেরুকরণ স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ আটকে যাওয়ায়, দলটির ভোটব্যাংক টানতে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে নানা কৌশল নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এনসিপি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগকে অপ্রাসঙ্গিক করার নীতি নিয়ে এগিয়েছে এবং এই ইস্যুতে সবসময় সোচ্চার থেকেছে। জুলাই গণহত্যাসহ আওয়ামী লীগের বিচার এবং সংস্কারের প্রশ্নে জামায়াত সক্রিয় থাকলেও, এটিকে অন্যতম রাজনৈতিক এজেন্ডা করেছে এনসিপি। নির্বাচনের পরেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার এনসিপি, যার ফলে দলটি নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হচ্ছেন।
ভারত প্রসঙ্গ ও এনসিপির দৃঢ় অবস্থান:
বিগত নির্বাচনগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের প্রচারে ভারত ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পেলেও, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দল দুটির প্রচারে এই ইস্যুটি তেমনভাবে দেখা যায়নি। বরং তারা এ বিষয়ে অনেকটা নীরব ছিল। এর বিপরীতে, এনসিপি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং নির্বাচনে অতীতের মতো দিল্লির হস্তক্ষেপ ঠেকাতে সোচ্চার ছিল। দলটির আহ্বায়কসহ প্রায় সকল দায়িত্বশীল নেতার বক্তব্য-বিবৃতিতে ভারত ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, “আমাদের আশঙ্কা, এই নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যোগসাজশ হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক বিএনপি নিজের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটা আমরা আগেও বলেছি, এটা নতুন কথা না। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের বিনিময়ে যদি তাদের পুনর্বাসন করা হয়, তাহলে সেটা প্রতিহত করা হবে।”
রাষ্ট্রপতি অপসারণ ও জুলাই সনদে স্বাক্ষর:
আওয়ামী লীগ আমলের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে যায় এনসিপি। কিন্তু এর সরাসরি বিরোধিতা করে বিএনপি। এই ইস্যুতে জামায়াত ছিল অনেকটা নিশ্চুপ। নির্বাচনের পর এখন রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের পর গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে এনসিপি। এ ক্ষেত্রেও বিএনপি-জামায়াত নীরব। গত বুধবার এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা মনে করি, প্রথম সংসদ অধিবেশনে প্রথম কাজটি হবে ফ্যাসিস্টের দোসর রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া।”
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার আগমুহূর্তে এনসিপি শর্তসাপেক্ষে জুলাই সনদে সই করে। দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “নোট অব ডিসেন্ট ব্যতিরেকে গণভোটের গণরায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে এই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলাম।” তবে, এর একদিন পরেই সনদ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
সংস্কারের লড়াই ও রাজপথের প্রস্তুতি:
এনসিপি রাষ্ট্র সংস্কারের পাহারাদার হিসেবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির প্রধান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হতেই হবে। যদি সংসদে না হয়, সেই লড়াই রাজপথে গড়াবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরাও রাজপথের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা খুবই স্পষ্টভাবে বলব, ট্রাইব্যুনালে যাতে আর কোনো হস্তক্ষেপ না করা হয়। ট্রাইব্যুনাল যাতে নিরপেক্ষভাবে সুষ্ঠু বিচারের পথে চলে।”
তিনি আরও জানান, “আমাদের যে দাবিগুলো ছিল সংস্কার, বিচার, অর্থনৈতিক লুটপাটের বিচার, ফ্যাসিবাদ এবং আধিপত্যবাদের কবর রচনা করা—সেই সবকিছুকে তোয়াক্কা না করে যারা সরকারি দলে রয়েছে, তারা জনগণের বিরুদ্ধে আবার অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
এনসিপি সারাদেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা আবারও শিগগিরই সারাদেশে যাব। এনসিপির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলব। দেশের সংকটে বারবার দাঁড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, স্কুল-কলেজ মাদরাসার ছাত্ররা। কিন্তু বারবার ছাত্রদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।”
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ২০০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, “বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা ও জুলাই গণহত্যায় তাদের সেই প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগও ভারতের মদদে ফ্যাসিস্ট হতে শুরু করে। বিগত ১৬ বছরে দলটি যা করেছে, তা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এসব দেখে আমরা বড় হয়েছি। সুতরাং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে, এনসিপি গঠনের পর থেকে এই নীতিতে আমরা ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকবো। এর মাধ্যমে আমরা গণতান্ত্রিক ও ইনসাফভিত্তিক দেশ গড়তে চাই।”
রিপোর্টারের নাম 
























