বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞের দীর্ঘ ১৭ বছর অতিবাহিত হলেও বিচার না পেয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে শহীদ কর্নেল মো. নাফিজ উদ্দিন মিঠুর পরিবার। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজন ও ভোলার দৌলতখান উপজেলার বাসিন্দারা।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোলার দৌলতখানে নিজ গ্রামে বাদ জুমা এক দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় মসজিদে আয়োজিত এই বিশেষ মোনাজাতে শহীদ কর্নেল নাফিজের আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপস্থিত মুসল্লি ও এলাকাবাসী।
পিলখানা বিদ্রোহের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় নাফিজের পরিবারকে। ছয় ভাইয়ের মধ্যে পঞ্চম নাফিজ ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী ও চৌকস সেনা কর্মকর্তা। তার বড় ভাই, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান মিয়া ছোট ভাইয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৭ বছর ধরে বিচারের আশায় পথ চেয়ে আছি, কিন্তু আজও ন্যায়বিচার পাইনি। নাফিজ যখন শেষবার চট্টগ্রাম থেকে পিলখানায় যাচ্ছিল, তখন ফোনে আমার কাছে দোয়া চেয়েছিল। সেটিই ছিল ওর সাথে আমার শেষ কথা।”
বিদ্রোহ চলাকালে কর্নেল নাফিজ তার স্ত্রী মুন্নি চৌধুরীকেও ফোন করেছিলেন। সেই শেষ কথোপকথনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মৃত্যু আসন্ন, তাই স্ত্রীকে তাদের একমাত্র সন্তান ওসামাকে দেখে রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ঘটনার পরদিন পিলখানার বীভৎস দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে আব্দুল মান্নান মিয়া আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “সেখানে গিয়ে দেখি বীভৎস লাশের স্তূপ আর রক্তে ভেজা ইউনিফর্ম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সিএমএইচে গিয়ে ওর নিথর দেহ পাই। সেই দিনের সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই।”
শহীদ কর্নেল নাফিজ উদ্দিন মিঠুর শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ার ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। দৌলতখান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি পিজিআর, এসএসএফ, ২ রাইফেল ব্যাটালিয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া সাবেক যুগোস্লাভিয়া ও লাইবেরিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও তিনি দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। পিলখানা ট্র্যাজেডির সময় তিনি রাইফেলস ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড স্কুলের কমান্ড্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
দেশের এই মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে হারিয়ে তার পরিবার ও এলাকাবাসী আজ দিশেহারা। তাদের এখন একমাত্র দাবি—পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
রিপোর্টারের নাম 























