বাংলাদেশে জ্ঞানী ও গুণীজনের কদর নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। প্রায়শই দেখা যায়, যারা গভীর প্রজ্ঞা ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী, তাদের সমাজে সঠিক মূল্যায়ন হয় না। বরং তাদের আপস করতে হয় জনরুচির সঙ্গে, নতুবা বরণ করতে হয় অবহেলা। এমনই এক দৃষ্টান্ত সৈয়দ মুজতবা আলী, যার বহুমাত্রিক জীবন ও প্রমত্ত প্রজ্ঞা আড়ালে পড়ে গিয়েছিল কেবলমাত্র ‘রম্যলেখক’ বা ‘উইটি আড্ডাবাজ’ পরিচয়ের ঘেরাটোপে। তার জীবন যেন আমাদের সমাজের প্রতি এক নীরব প্রশ্ন, কেন আমরা আমাদের সেরা মানুষগুলোকে ধরে রাখতে পারি না।
নিজের কওমের সমালোচনা করা যেমন আত্মক্ষত করারই নামান্তর, তেমনি এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করাও অনুচিত যে, বাংলাদেশ প্রায়শই তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যথার্থ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। এখানে জ্ঞানী ব্যক্তিকে পদে পদে আপস করতে হয় প্রচলিত ধারণার সঙ্গে, জনরুচির বাহক হতে হয়; অন্যথায় তার প্রতি ধেয়ে আসে অসম্মান। বিশেষত, যিনি এক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হয়ে বহু বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং নিজস্ব চিন্তা লালন করেন, তার জন্য সমাজের দরজা যেন আরও সংকুচিত হয়ে আসে।
এই প্রেক্ষাপটেই মনে পড়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন। তাকে কেবল ‘রম্যলেখক’ বা ‘উইটি আড্ডাবাজ’ হিসেবে সীমাবদ্ধ করে রাখা এক ধরনের অপমান বৈকি। এটি তার প্রমত্ত প্রজ্ঞা ও বিচিত্র দুনিয়াব্যাপী ছড়ানো জীবনের প্রতি এক গভীর অনীহার প্রতিফলন। সম্ভবত, তার বাংলাদেশি জীবনে ধনসম্পদ বা প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করতে না পারার প্রতি এক প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্যও এর পেছনে কাজ করে থাকতে পারে। সালাম শাহ সৈয়দ আহমদ মোতাওয়াক্কিল (র.) পীর বংশের এই ব্যতিক্রমী সন্তান, যিনি জানার আনন্দে জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন অসীম অবজ্ঞা ও ব্যর্থতা।
তার জীবনের এক ঝলক দেখলে বোঝা যায়, তিনি কতটা বহুমাত্রিক ছিলেন। এক ছবিতে সুদর্শন ও সুবেশী যুবক আলী সাহেবকে দেখা যায়, তখন তিনি এক জার্মান স্বর্ণকেশীর সঙ্গে গভীর প্রণয়ে লিপ্ত। সেই প্রেম পারিবারিক বাধায় পরিণতি পায়নি। অথচ ততদিনে তিনি ১৮টি ভাষা আত্মস্থ করেছেন এবং খোজাদের নিয়ে তার পিএইচডি থিসিস প্রায় শেষ পর্যায়ে। এমন এক প্রজ্ঞাবান ও সংবেদনশীল মানুষকে কেবল একটি পরিচিতির মধ্যে আটকে রাখা নিঃসন্দেহে তার প্রতি অবিচার। তার জীবন যেন আমাদের সমাজের প্রতি এক আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হয় মেধার প্রতি আমাদের উদাসীনতা এবং স্বাধীন চিন্তার প্রতি আমাদের অনীহা।
রিপোর্টারের নাম 

























