অফিসের কাজে আমি সিলেট যাব। সেখানে তিনদিন থাকতে হবে। আজকেই এসেছে সিদ্ধান্তটা। আমি না যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু অফিসের সিদ্ধান্ত আমাকেই যেতে হবে। ও কাজে আমি ছাড়া অন্য কেউ গেলে হবে না। আমি অনেক দুশ্চিন্তায় পড়ি। অফিসকে ম্যানেজ করতে পারিনি। বাসাকে কী ম্যানেজ করতে পারব? আমি গেলে সীমা একা কী করে থাকবে? আমি অফিস থেকে ফিরে প্রথমেই কিছু বলি না। অন্যান্য দিনের মতোই সুখে-সান্নিধ্যে সময় কাটাতে থাকি। আমরা একসাথে রাতের খাবার খাই। আমি অনেকবার ভেবেছি রাতে খাবার টেবিলেই কথাটা বলব কিন্তু সুযোগ পেলাম না। যথারীতি খাবার শেষ করে আমরা একটু সময় টিভির সামনে বসি। সেখানেও আমি কথাটা বলার সুযোগ পেলাম না। আমরা সারাদিনের গল্প করছি। অনেক হাসি আনন্দ করছি। কিন্তু যে কথাটা বলা প্রয়োজন সে কথাটা সত্যি করে বলতে পারছি না। এ রকম হাসি আর আনন্দময় মুহূর্তগুলো আমি কী করে নষ্ট করি? কিন্তু বলাটা যে অনেক জরুরি। কালকে রাতেই তো আমাকে চলে যেতে হবে। সারাদিন অফিসে থাকব। এখন না বললে আর কখন বলব? আমি একথা সে কথা বলে ঐদিকে কথাগুলো ঘুরিয়ে নিতে চাই।
এক সময় আমি সীমাকে বলি, তোমার সাথে জরুরি একটা কথা আছে। সীমা বলে, বলেন।
আমি আমতা আমতা করতে থাকি। কিন্তু বলতে পারছি না।
কী বলবেন, বলেন।
তবুও আমি বলতে পারছি না।
বলছেন না কেন? কোনো সমস্যা?
না, তেমন কিছু না। আমি বললাম, আমাকে অফিসের কাজে কাল একটু সিলেট যেতে হবে। ওখানে তিনদিন থাকতে হবে।
কেন?
অফিসের কাজে। অফিস দায়িত্বটা দিয়েছে।
আপনি না গিয়ে অন্য কাউকে পাঠান।
ওটা আমার অ্যাসাইনমেন্ট। আমাকেই যেতে হবে। অন্য কাউকে দিয়ে এই অ্যাসাইনমেন্ট হবে না।
আপনি ওখানে যাবেন এবং তিনদিন থাকবেন। তাহলে আমি কোথায় থাকব? এটা কী সম্ভব, আপনিই বলেন?
আমি জানি, বিষয়টা আমাদের জন্য সহজ নয়।
আমি একা এ বাড়িতে কীভাবে থাকব?
আমিই বা তোমাকে ছেড়ে একা কীভাবে থাকব?
অফিসকে বোঝান।
সে কথা আমি ভেবেছি, অফিসকে বলেছি কিন্তু সমাধান খুঁজে পাইনি।
সমাধান তো পেতেই হবে।
এ বাড়িতে একা থাকা যাবে না। তা ছাড়া আমি কী আপনাকে ছাড়া একরাত ঘুমিয়েছি?
না, তা ঘুমাওনি।
আমি আপনাকে ছাড়া এক রাতও থাকব না।
তাহলে কী করব?
হয় আপনি যাবেন না নতুবা আমাকেও সাথে নিয়ে যেতে হবে।
আমি তো অফিসে কাজ করব, তুমি তখন কী করবে?
হোটেল রুমে বসে থাকব আর আপনার ফেরার পথ চেয়ে অপেক্ষা করব। তবুও রাতটুকু তো একসাথে থাকা হবে।
ঠিক আছে, আমি আগে অফিসে যাই। তারপর সিদ্ধান্ত নেব এবং তোমাকে জানাব।
জানানো টানানো বুঝি না। হয় আপনি যাবেন না, নয়তো আমাকেও সাথে নিয়ে যেতে হবে।
আচ্ছা, দেখি কী করা যায়।
অফিসে গিয়ে আমি সবকিছু বসকে খুলে বললাম। তিনি প্রথমে রাজি হলেন না। পরে অনেক কথা কাটাকাটির পর রাজি হলেন। কিন্তু শর্ত দিলেন উনি অফিসের কোনো সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন না। আমি তাতেও রাজি হয়ে যাই। অফিসের সুবিধা আমার দরকার নেই। আমার সমস্যাটা সমাধান হলো, এতেই আমি খুশি। আমি খুশির খবরটা সীমাকে দিই এবং আমাদের ব্যাগ-ব্যাগেজ গোছাতে বলি। খবরটা শুনে সীমা তো মহাখুশি। আমি অফিস থেকে ফেরার আগেই ও সবকিছু গোছগাছ করে রাখে। সে প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত। তার হাসি আর আনন্দ যেন থামছে না। বাসায় এসে দু’মুঠো খাবার খেয়েই আমরা কমলাপুর রেলস্টেশনের দিকে রওয়ানা হই। স্টেশনের একটু আগে থেকেই প্রচণ্ড জ্যাম। এই সামান্য রাস্তাটুকু পেরুতেই বহু সময় লেগে যাবে। তাতে ট্রেন মিসও হয়ে যেতে পারে। তাই আমি আর রিস্ক নিতে চাইলাম না। ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে ওখানেই আমরা নেমে পড়ি। তারপর ট্রলি আর ব্যাগ টেনে নেওয়া অনেক কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। সীমাকে বলি, তুমি শুধু নিজেকে সেভ করে সামনে এগিয়ে যাও। সীমা ভিড় ঠেলে এগোচ্ছে, আর আমি পেছনে, একটি ব্যাগ কাঁধে, আর দুইটি ট্রলি ব্যাগ দুই হাতে নিয়ে পেছনে পেছনে এগোতে থাকি। স্টেশনের উপর ওঠার পর ভিড় আর ভিড়, লোকে লোকারণ্য। কোনোভাবেই সামনের দিকে এগুনো যাচ্ছে না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু মাথায় কিলবিল করছে ট্রেনে উঠার চিন্তা। ফেরিওয়ালারা গায়ের উপর উঠে এটা সেটা বিক্রির চেষ্টা করছে। টিকিট কাউন্টারে বিশাল বিশাল লাইন। ভিন্ন ভিন্ন ট্রেনের ভিন্ন ভিন্ন কাউন্টার, তাদের গন্তব্যও ভিন্ন। আবার কারো কারো ট্টেন ছেড়ে যাবার সময় হয়ে গেছে। তারা প্রাণপণ দৌড়াতে চেষ্টা করছে। মানুষের কোলাহল আর কলরবে মুখরিত প্লাটফর্মে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। কানের কাছে মুখ নিয়ে কথা বলতে চেষ্টা করলেও কোনোকিছু শোনা যাচ্ছে না। স্থায়ী দোকানগুলোতে একবিন্দু দাঁড়ানোর ঠাঁই নেই। সবাই কিছু না কিছু কিনছে আবার কেউ কেউ কিছু না কিছু খাচ্ছে। আবার অনেকে ট্রেনের খাবার দামি বলে বাইরের দোকান থেকে খাবার কিনে নিয়ে যাচ্ছে। দোকানগুলো আয়তনে ছোট হলেও ওখানে রয়েছে প্রচুর মালামাল। সেখানে দাঁড়িয়ে বিক্রি করাটাও কষ্টসাধ্য। কেউ খেয়ে বা কিছু কিনে যেন দাম না দিয়ে চলে যেতে পারে। সেজন্য প্রতিটা দোকানে রয়েছে বেশ কয়েকজন করে বিক্রেতা ও তার সহযোগী। তারা বিক্রির পাশাপাশি পাহারা দিচ্ছে, কেউ কিছু খেয়ে বা কিছু কিনে টাকা না দিয়ে যেন বেরুতে না পারে। দোকানগুলোতে বেশিরভাগ আইটেম খাবার ও খেলনার। অনেক চেষ্টা ও কষ্ট করে অবশেষে আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মে পৌঁছায়। তখনও ট্রেন আসার দশ মিনিট বাকী। ওখানে পৌঁছাতে পেরে আমরা সবার আগে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। সীমা আইসক্রিম খেতে চাইল। আমি একজন ফেরিওয়ালা ডেকে ওকে একটা আইসক্রিম কিনে দিলাম। আইসক্রিম পেয়ে ও প্রচণ্ড খুশি। আমি তো কাছের মানুষগুলোকে জোর করে খাওয়াতে পারলে প্রচণ্ড খুশি হই। ওর খুশি দেখে আমারও খুশি লাগছে।
অবশেষে আমরা ট্রেনে উঠলাম এবং আমাদের সিটে বসলাম। নির্ধারিত সময়েই ট্টেন ছাড়ল। ট্রেন যতই এগিয়ে চলল তার সাথে গতিও বেড়ে যেতে লাগল। ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্ট বলে ওখানে এসি ছিল। বাইরে গরম থাকলেও ভেতরে আমরা একদম গরম বোধ করলাম না। সীমা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ওর চোখে-মুখে তৃপ্তি আর আনন্দের ছড়াছড়ি। অতি আনন্দে কী করবে না করবে ভেবে পাচ্ছে না। ও আমার কাঁধে মাথা রেখে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আছে। এ সময় একজন ফেরিওয়ালা আমাদের কম্পার্টমেন্টে আসে। তার কাছে কাটলেট, পাউরুটি, টোস্ট, নানা রকমের চকলেট, নানা রকমের চিপস, কোল্ড ড্রিংস, চা, কফি ও অন্যান্য খাবারের উপকরণ ছিল।
আমি সীমাকে বলি, কী খাবে?
কিছু খাব না।
তাই কী কখনো হয়?
কিছু তো একটা খেতেই হবে।
কেন, আমি কী বাচ্চা মানুষ? না দিলে কাঁদব?
না, তা নয়।
আপনার ইচ্ছে করলে আপনি খান।
আমি কী একা খাব?
আমি খেলে কী আপনি খাবেন?
তাহলে খেতে পারি।
ঠিক আছে।
আমরা কাটলেট, চিপস ও কফি খেলাম।
সীমা খুশিতে আত্মহারা। সে নাকি আজই প্রথম কারো সাথে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে। এটা নাকি তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। তখন আমি ভাবলাম, আজ যদি ওকে সাথে নিয়ে না আসতাম তাহলে ও ভীষণ কষ্ট পেত। অনেক নির্মম হতো ব্যাপারটা। ট্রেনটি যতবার স্টপেজ দিয়েছে এবং ক্রসিং-এর জন্য থেমেছে, ততবারই আমরা ট্রেন থেকে নিচে নেমেছি। হেঁটেছি। নানান এলাকার নানান মানুষের সাথে গল্প করেছি, তাদের চালচলন দেখেছি, কথাবার্তা লক্ষ্য করেছি। যতদূর দেখা যায় সে এলাকাকে দেখেছি। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমার স্বপ্ন ছিল, একদিন প্রিয় মানুষের সাথে দূরের কোনো শহরে বেড়াতে যাব। তার হাতে হাত ধরে হাঁটব, পাশাপাশি বসে থাকব, গল্প করব, কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে থাকব, ঘুমাব। আর সেই শহরটা যদি সিলেট বা চট্টগ্রাম হয়, তখন তো আনন্দের সীমা থাকে না। আমরা ট্রেন থেকে নেমে হাঁটছি। আবার ট্রেন যখন চলতে শুরু করেছে তখন দৌড়াদৌড়ি করে ট্রেনে উঠেছি। এভাবে উঠা নামার মাঝেও চরম আনন্দ। যদিও আনন্দ একেক মানুষের একেক রকম। আমরা এসবেই আনন্দ পাচ্ছিলাম।
যত জায়গায় আমরা নামছি, তার প্রায় সব জায়গায় আমরা কিছু না কিছু খাচ্ছি। আমি আবার জোর করে খাওয়াতে পটু। সীমা নিজ থেকে খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়াচ্ছি। নিজেও খাচ্ছি। কোথাও ঘুরতে গেলে সবারই অতিরিক্ত খাওয়াদাওয়া হয়, আমারও হয়। অতিরিক্ত এবং উলটাপালটা খাওয়া হয় বলে অনেক সময় শরীরও খারাপ করে। তবুও রোজার মজা তো খাওয়ার উপরও নির্ভর করে। সিলেটের রাস্তাগুলো অনেক সুন্দর। প্রকৃতি সুশোভিত আঁকাবাঁকা রাস্তা, আবার রাস্তার পাশে টিলা, চা বাগান, বন-জঙ্গল, পাহাড় পর্বত সব মিলিয়ে রাতের বেলা অপরূপ লাগছে। তখনও আমরা ডিনার সারিনি। কিন্তু এই অবস্থায় আমরা বিচার করব কেমন করে? ট্রেনের ভেতর সকল যাত্রীর আলাপ আলোচনা, মোবাইল ফোনের আওয়াজ, ফেরিওয়ালার সব সব মিলিয়ে একটা হাঁকডাক পরিবেশ। সীমা উৎসবমুখর আর এক বলছে, পানিও খেতে পারবে না। পেটে জায়গা নেই। আমারও একই অবস্থা। আমরা আপাতত ডিনার করা থেকে বিরত থাকলাম। আরও ফোঁটা পড়ে ডিনার করে নেব, আমরা হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে সুবিধামতো না হয় ডিনার করব। সীমার ইচ্ছে পরে ডিনার না করলে কী এমন ক্ষতি একরাত তাছাড়া আমরা তো অভুক্ত নই।
হোটেলে পৌঁছে আমরা দিশেহারা হয়ে যাই। ফাইভ স্টার হোটেল। ঢুকতেই বিশাল লবি। সেখান দিয়ে কিছুটা এগোলেই রিসেপশন। রিসেপশনে অনেকগুলো সোফা। সেখানে অনেক লোকের ভিড়। আমরা সেখানে বসলাম হোটেলের ফরমালিটিসগুলো কমপ্লিট করতে। প্রথমেই আমাদেরকে ওয়েল কাম ড্রিংস খেতে দিল। সেখান থেকে একে একে ফরম ফিলাপ করে নিজ নিজ রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সিরিয়াল এলো এবং ফরম ফিলাপ ও নানা ফরমালিটিস কমপ্লিট করে আমাদেরকে ৭ তলায় দক্ষিণ-পূর্ব কর্নারের একটি রুমে পাঠাল। হোটেলে রয়েছে সুইমিং পুল, স্পা, জিম্নেশিয়াম, আমরা তো রুম দেখেই হতবাক। রুমে কী নেই? হোটেলে, টেবিল, চেয়ার, সোফা সেট, অত্যাধুনিক টিভি, ল্যাপটপ, ওয়াইফাই, ইন্টারকম, ড্রেসিং টেবিল, আলমারি উইথ আলনা, নানা রকমের লাইটিং, ফ্রিজ আর ফ্রিজের পানি, সফট ড্রিংক্স, জুস, আইসক্রিম, ফল-ফ্রুটস রাখা আছে। টেবিলের উপর একটা ট্রেতে চকলেট, বিভিন্ন রকমের বাদাম, আরও কত কী সাজানো। খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু খেতে পারছি না। ইন্টারকম থেকে ফোনে জানতে চাচ্ছে আমাদেরও আর কিছু প্রয়োজন আছে কিনা। আমি বললাম প্রয়োজন হলে জানাব। বাথরুমে নানা রকম উপকরণ সাজানো। হাই কমোড, হ্যান্ড শাওয়ার, পুশ শাওয়ার, হট অ্যান্ড কোল্ড ওয়াটার সিস্টেম, তাদের ব্র্যান্ডিং সাবান, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, শ্যাম্পু, আফটার সাওয়ার টারকিস গাউন, টাওয়েল ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। আমরা রোমান্টিক জড়াজড়ি শেষে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের নিজস্ব রেস্টুরেন্টে যাই। সেখানে গিয়ে অর্ডার দিলে বিশ/পঁচিশ মিনিট পর খাবার এনে দেয়। অর্ডার দেবার পরে ওরা খাবার রেডি করে। আমরা ততক্ষণ ওয়েট করি এবং নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করতে থাকি। আমরা খাবারের অর্ডার দিয়েছিলাম ইলিশ ভর্তা, ইলিশের ডিম ভুনা, প্রাণ কষা, মুরগীর রোস্ট, ডাল আর আইড় মাছ। আধঘণ্টা পরে খাবার চলে এলো টেবিলে। মেসিয়ার খাবারগুলো সার্ভ করে দিচ্ছিল। আমরা আস্তে আস্তে খেতে থাকি। খাবার শেষে বিল পরিশোধ করে আমরা আমাদের হোটেল রুমে যাই এবং ড্রেস পালটিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ি। আজ আমরা ঘুমাব না। ঘুরব সারাটা শহর। কোথায় কী আছে দেখে নিতে চাই। আমরা অনেকক্ষণ ঘুরলাম। রাতের সিলেট তো আরও সুন্দর। আরও অপরূপ। সারারাত লোকজন রাস্তায় রাস্তায় আনাগোনা করে। রাতে আরও ভিড় বাড়ে। মাজারগুলো, বাসস্ট্যান্ডগুলো, প্রতিটা রাস্তার মোড়, হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলোর সামনে লোকে লোকারণ্য। রাতের সিলেট উপভোগ করে আমরা হোটেল-কক্ষে ফিরে এলাম অনেক রাতে। আমাদের কাছে প্রতিটি দৃশ্য এবং প্রতিটি মুহূর্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
হোটেল কক্ষে ঢুকেই আমি সীমাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় ফেলে গড়াগড়ি করতে থাকি। সীমা বলতে থাকে প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও না। এখনি সবকিছু, খাবার দাবার আমার গলা দিয়ে বেড়িয়ে আসবে। আমি তো নাছোড় বান্দা, কোনো অবস্থাতেই ছাড়ব না। অবশেষে ছেড়ে দেই। আমরা আবার শাওয়ার নিই এবং ফ্রেশ হই। এক সময় শুয়ে পড়ি। শুয়ে শুয়ে স্মৃতির পাতায় হাতড়ে বেড়াই। সারাদিন কী করলাম? কী করিনি? কী করা উচিত ছিল? কী পেলাম এবং কী পেলাম না। পরদিন সীমাকে হোটেল রুমে একা রেখে আমি অফিসের কাজে বেরিয়ে যাই। বিকেল বেলা অফিস থেকে ফিরে আসি। হোটেলে ফিরে একটু রেস্ট নিই। তারপর আমরা বেরিয়ে পড়ি। শহরের আশেপাশে ঘুরে বেড়াই। আমরা কোনোদিন পাঁচভাই রেস্টুরেন্ট, কোনোদিন পানসি রেস্টুরেন্ট, কোনোদিন আমাদের হোটেলের রেস্টুরেন্ট মানে একেকদিন একেক রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করি। প্রতিটি রেস্টুরেন্টে খাওয়ার টেস্ট আলাদা, পরিবেশ ও রান্নার মানও আলাদা।
অফিসের কাজ শেষ হলে আমরা প্রথমদিন ভোলাগঞ্জ, সাদা পাথর দেখতে যাই। যাবার আগে সে কী উত্তেজনা! আমরা একটা প্রাইভেটকার আপ-ডাউন ভাড়া করে ভোলাগঞ্জ চলে যাই। যাওয়ার পথের দু’ধারে অনেক সুন্দর দৃশ্য। প্রথমেই চা বাগান এবং প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যাবলি। দু’একটা জায়গায় আমরা দাঁড়ালাম এবং ছবি উঠালাম। এক সময় আমরা ভোলাগঞ্জ পৌঁছালাম। সেখানে নৌকা পেতে মহা ঝক্কি-ঝামেলা। নৌকা ভাড়ার টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। টিকিট পেতে প্রায় আড়াইঘন্টা লেগে যায়। তারপর আবার নৌকার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হলো। অবশেষে নৌকা এলো। আমরা নৌকায় ওঠে সাদা পাথরের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করলাম। আঁকাবাঁকা নদীর বাঁক পেরিয়ে প্রায় ত্রিশ মিনিট পর আমরা কাঙ্ক্ষিত পাথরের কাছে পৌঁছালাম। আমাদের সামনে মোটা বালুচর ও পানিতে নানা সাইজের পাথরে ভরা। তার উপর দিয়ে কূল কূল শব্দে বয়ে চলেছে ঠান্ডা পানির পাহাড়ি লেক। আমাদের সামনেই ভারতের মেঘালয় পাহাড় আর তার বুক থেকেই কূল কূল শব্দে নেমে আসছে পাহাড়ি জলের ধারা। আমরা লেকে নামার পূর্বেই সুইমিং ড্রেসগুলো পড়ে নিলাম। আগে ছিল না কিন্তু এখন ড্রেস পালটানোর জন্য রয়েছে ছোট ছোট চেঞ্জিং রুম। আমরা পা টিপে টিপে জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। সীমা আনন্দে আত্মহারা কিন্তু খুব ভয় পাচ্ছে। পানিতে ভেসে যাবে না তো। তা ছাড়া পাথরগুলো পিচ্ছিল। কিন্তু পানিতে অগণিত মানুষ। আমি ওকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছি। ও আমাকে শক্ত করে খামচে ধরে আছে। আস্তে আস্তে আমরা জলের মূলধারায় পৌঁছে যাই। আমি জলের নিচে একটি বড়ো পাথরের উপর বসি। সীমা আমাকে ছেড়ে আলাদা বসবে না। সে ভয় পাচ্ছে, না জানি ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। সে নাকি শুনেছে প্রতিবছর জলে ভেসে কোনো কোনো পর্যটক নিখোঁজ হয়ে যায়। ও আমাকে আঁকড়ে ধরে বুকের কাছে বসে আছে। এবার আমি ওকে মেঘালয়ের পাহাড় দেখাই, ভারত বাংলাদেশের সীমান্ত দেখাই, পাথরের গল্প বলি, ঠান্ডা জলের কারণ ব্যাখ্যা শোনাই। ঠান্ডা পানির মধ্যে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেই। এখন সীমা আর উঠতে চায় না। আরও একটু থাকি না বলে অনুনয় করতে থাকে। এমন করতে করতে বহু সময় জলের মাঝে কাটাই। আমারও উঠতে ইচ্ছে করে না। এমন শান্তিময় অনুভূতি, এমন জলের কূল কূল শব্দ, পাহাড় পর্বতে ঘেরা এমন নৈসর্গিক ও মোহনীয় স্থান আর কোথায় পাওয়া যাবে? সীমা আগে ভয় পেয়েছিলো কিন্তু এখন আর উঠতে চাচ্ছে না। সারাদিন আমরা ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরে কাটিয়ে আবার সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই এবং আমাদের হোটেলে ফিরে আসি। হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে আমরা হোটেলের ক্যান্টিনে খাবারের জন্য যাই এবং আমাদের রাতের খাবার গ্রহণ করি। তারপর একটু হাঁটাহাঁটি করে রুমে ফিরে যাই। একটু পর আবার বের হই এবং রাতের সিলেটে ঘুরে বেড়াই। এই স্মৃতি, এই মধুময় অনুভূতি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমাদের স্মৃতিতে। আমরা কারো সাথে এমন ভ্রমণ প্রত্যাশী ছিলাম সারাজীবন ধরে।
পরদিন আমরা বিছানাকান্দি ভ্রমণে গিয়েছিলাম। বিছনাকান্দির রাস্তা অতটা ভালো নয় বলে আমাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে অবেলা হয়ে যায়। বাকী অনুভূতিগুলো ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরের মতো। ভোলাগঞ্জ এবং বিছানাকান্দির গঠনবৈশিষ্ট্য প্রায় একরকম। শুধু চারিপাশের দৃশ্যাবলিতে কিছুটা ভিন্নতা। বিছানাকান্দিতেও আমারা অনেক মধুময় সময় কাটিয়েছি। সন্ধ্যায় আমরা হোটেলে ফিরে আসি এবং রাতের খাবারের জন্য অন্য একটি হোটেলে যাই। সেখানে সবার জন্য ভাত আর ডাল ফ্রি, বাকী খাবারের জন্য বিল পরিশোধ করতে হয়। হোটেলটাতে প্রচণ্ড ভিড়। অল্প আয়ের লোকজনও এ হোটেলে খেতে আসে। কিন্তু হোটেলটির খাবারের মান খুব ভালো। অনেকদূর থেকে অনেক মানুষ এই হোটেলে খেতে আসে। এই হোটেলটির অন্যান্য খাবারও বেশ দামি এবং সুস্বাদু।
পরদিন আমরা রাতারগুল ভ্রমণে যাই। এই রকম একসাথে জলাশয় এবং ফরেস্ট পৃথিবীতে বিরল। ওখানে গিয়ে আমাদের চোখ ছানাভরা। এটা তো সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটা পর্যটনকেন্দ্র। যাই হোক, সেখানে একটা নৌকা ভাড়া করে জলাশয়ে ভেসে যাই। গাছ গাছালির ফাঁকে ফাঁকে নদী। সেই নদী বেয়ে গাছের রাজ্য অবলোকন একটা ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। অবশ্য শুনেছিলাম গাছগুলো থেকে হঠাৎ হঠাৎ দুয়েকটি সাপ নাকি ঝরে পড়ে। রাতারগুলের ভেতর অসংখ্য নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে। সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটা পর্যটনকেন্দ্র এটা। এখানে এসেও সীমা প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে। এক একটি জন্যও আমার হাত ছাড়েনি। ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকলো। আমি ভাবি এই মেয়ে এত ভীতু, তবে জীবনের এতটা পথ একা একা সেকেন্ডের করে কাটিয়ে এলো? জীবনের বাকী পথগুলো কী কী
আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কী এখানে মজা পাচ্ছ না?
ও মাথা নাড়ে।
আমি বলি, মুখে বলো, এখানে মজা পাচ্ছ না?
সে বলল, ভীষণ মজা পাচ্ছি।
তবে কথা বলছো না কেন?
একটু একটু ভয় হচ্ছে।
ভয় হচ্ছে কেন?
এখন বলব না।
কেন?
তাতে ভয় আরো বেড়ে যাবে।
আচ্ছা, পরে বলো।
আমরা সারাদিন রাতারগুল ঘুরে রাতের বেলা হোটেলে ফিরে আসি এবং ও ভীষণ খুশি। ও ভয় পেয়েছে ঠিক কিন্তু এত সুন্দর একটা পরিবেশ সে আগে কখনো দেখেনি। আমি ওর জীবনে না থাকলে ও এই রাতারগুলকে কখনো দেখতে পেত না। এজন্য তার কৃতজ্ঞতা ঝরে ঝরে পড়ে। সে দিশেহারা হয়ে যায়, জীবনে হয়ত কোনো পুণ্য করেছি বলেই আজ আপনার মতো একজন মানুষের সঙ্গী হতে পেরেছি। সে জানতে চায় এমন ফরেস্ট কী পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে? আমি বলি, জানি না, শুনিনি। তবে থাকতে পারে। হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে আমরা অন্য আরেকটা হোটেলে খেতে যাই। এই হোটেলে খাবার মান অনেক ভালো। এখানে দামও অন্যান্য হোটেলের তুলনায় একটু বেশি। যে কোনো মানুষ এ হোটেলের কাস্টমার হতে পারে না।
তারপর দিন খুব সকালে ওঠে আমরা শাপলা বিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। খুব সকালে ওখানে পৌঁছাতে হবে। সূর্য ওঠলে শাপলাগুলো ফুটন্ত অবস্থায় থাকে না, চুপসে যায়। আমরা শাপলা বিলে নৌকা করে ঘুরে বেড়াই। বড়ো বড়ো শাপলা ফুল এবং শাপলা ফুলের গোল গোল পাতাগুলোও বেশ বড়ো হয়। অপরূপ শাপলা ফুলের বিলে বিলি কেটে কেটে আমাদের নৌকাগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বিলে কী যে অনুভূতি হয় তা কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব নয়। মাথার উপর সূর্যের আলো তখনো ফুটেনি, চারিদিকে অপরূপ শাপলা ফুল সে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। বিলের একপাশটা পাহাড়ের সাথে মেশানো প্রকৃতি আরো অপরূপ করে তুলেছে বিলটিকে।
শাপলা বিল থেকে ফেরার পথে আমরা সূর্যমুখীর বাগানে যাই। সূর্যমুখীর নাম সূর্যমুখী হলো কেন এটা আমি সে দিনই প্রথম শুনি। অর্থাৎ সূর্য যেদিকে থাকবে ফুলটির মুখ সেদিকেই থাকবে। তাই সকালবেলা ফুলটি পূর্বমুখী, দুপুরবেলা ঊর্ধ্বমুখী এবং বিকেলবেলা পশ্চিমমুখী থাকে এই ফুলগুলো। মাঠের পর মাঠ বিশাল আকৃতির সূর্যমুখী ফুলের বাগান সত্যিই অপরূপ। একটার চেয়ে আরেকটা সুন্দর। একেকটা একেক রকমের সুন্দর। স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো প্রতিটি স্মৃতি। মন তৃপ্ত হয় না। কোনোটার চেয়ে কোনোটার স্মৃতি কম আনন্দের নয়। ফেরার পথে আমরা পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেলে যাই। সেখানে নাস্তা ও কফি খেয়ে আমরা হোটেলে ফিরে আসি।
তারপর দিন আমরা সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ অনেক দূর। আমরা প্রথমে শিমুল বাগানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। বহুকষ্টে সুনামগঞ্জ পৌঁছাই। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে করে শিমুল বাগান যাই। অনেক বড়ো শিমুলবাগান। টিকিট কেটে শিমুলবাগানে ঢুকতে হয়। সারি সারি করে গাছগুলো লাগানো। প্রায় সম আকৃতির প্রতিটি গাছ। ডালে ডালে শিমুল ফুল দেখে মনে হয়েছে গাছে গাছে যেন আগুন লেগেছে। সারাদিন ওখানে ঘোরলেও তৃপ্তি হবে না। সেখানে আবার ঘোড়া পিঠে চড়ে বেড়ানো যায়।
শিমুলবাগান থেকে আমরা বাঁশবাগানে যাই। সারি সারি অনেকদূর পর্যন্ত বাঁশবাগান। সেখানে অল্পক্ষণ ঘুরে আমরা বারিকের টিলায় যাই। বারিকের টিলার উপর থেকে নিচের লেকটাকে মনে হয় গাঢ় নীল রঙের পানি। একটাই নীল আর স্ফটিক জল যে তার তল পর্যন্ত দেখা যায়। তারপর আমরা আরো কয়েকটা লেকের ধারে ঘুরে বেড়াই। পাহাড়ের গাঁয়ে মিশে থাকা লেকগুলো নীল জলের লেক। এরপর আমরা অপেক্ষা করি ইন্ডিয়ান পাহাড়গুলোতে সন্ধ্যার বাতি জ্বলে উঠার জন্য। ইন্ডিয়ার পাহাড়ের মাথায় জঙ্গলের ভেতর লাইটগুলো জ্বলে ওঠলে সে এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা হয়। এই দৃশ্য পর্যটকদের খুব কাছে টানে।
সেদিন আমরা সুনামগঞ্জেই রাত কাটাই এবং পরদিন সকালে টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সেখানে পৌঁছে আমরা নৌকা ভাড়া করি এবং হাওরের মাঝে ঘুরে বেড়াই। চারিদিকে হাওর, পাখিদের কিচিরমিচির পেরিয়ে আমরা একটা বনভূমিতে নামি। সেখানে ওয়াচিং টাওয়ার, বিভিন্ন গাছগাছালি দেখছি আবার কোনোটাতে উঠছি। সেখানে অদ্ভুত এক গ্রুপ ছোট বাচ্চাদের দল পেয়ে গেলাম। তারা আমাদের গান শোনাচ্ছে। ভালো ভালো পরিচিত গান আবার ওদের কণ্ঠও বেশ সুন্দর। আমরা দীর্ঘসময় ওদের সাথে কাটালাম। অবশ্য গান শোনানোর জন্য ওদেরকে পেমেন্ট করতে হয়েছে। তবুও ওদের সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকার মতোই।
রিপোর্টারের নাম 

























