ঢাকা ০৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রণক্ষেত্রে ড্রোনের একচ্ছত্র আধিপত্য: এআই ও প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের সমীকরণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৪৯:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ এই সময়ে যুদ্ধের চিরাচরিত ব্যাকরণ ও রণকৌশলে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এক সময়কার দাপুটে ট্যাংক বহর কিংবা বিশাল পদাতিক বাহিনীর পরিবর্তে বর্তমান রণক্ষেত্রে এখন ড্রোনের জয়জয়কার। আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে একটি যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে, ইউক্রেন এখন তার এক জীবন্ত উদাহরণ।

যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়ার বিশাল সেনাবাহিনী ও ভারী ট্যাংক বহর মূল শক্তি হলেও, বর্তমানে ছোট ও সস্তা ড্রোনই হয়ে উঠেছে প্রধান মরণাস্ত্র। ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধক্ষেত্রে বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতির মূলে রয়েছে ড্রোন। সম্মুখভাগের পরিস্থিতি এখন এতটাই বিপজ্জনক যে, প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য ‘কিল জোন’। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে এই এলাকায় কোনো কিছুর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ধরা পড়া এড়াতে সেনারা এখন বড় দলের বদলে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দ্রুত চলাচল করে এবং তাদের নজর থাকে সবসময় আকাশের দিকে। ভারী সাঁজোয়া যানগুলো ড্রোনের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় রসদ সরবরাহ বা আহতদের সরিয়ে নিতে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় স্থল-রোবট।

এই ড্রোন যুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করা। শুরুর দিকে রেডিও সিগন্যালে ড্রোন চালানো হলেও ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের কারণে তা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এর বিকল্প হিসেবে রুশ বাহিনী এখন অতি-পাতলা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বা তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার করছে, যা জ্যামিং প্রযুক্তিতে অচল করা অসম্ভব। এর ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদগুলো এখন তারের জালে ছেয়ে গেছে, যা কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়। অন্যদিকে, ইউক্রেনীয়রা স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা স্টারলিংক টার্মিনালের মাধ্যমে দূরপাল্লার ড্রোন পরিচালনা করছে। তবে সম্প্রতি রাশিয়ার অবৈধ টার্মিনালগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ফলে দুই পক্ষই নতুন করে কৌশল সাজাতে বাধ্য হচ্ছে।

ড্রোনের এই ব্যাপক বিস্তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এনেছে। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন ধ্বংস করতে লাখ লাখ ডলারের মিসাইল খরচ করা এখন অলাভজনক। এর বদলে তৈরি হচ্ছে ‘ইন্টারসেপ্টর ড্রোন’, যার কাজ হলো আকাশেই শত্রু ড্রোনকে আঘাত করা। এছাড়া ট্রাক ও সাঁজোয়া যানে বিশেষ জ্যামার এবং ড্রোন হামলা ঠেকাতে লোহার খাঁচা বা জালের ব্যবহার এখন সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।

প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে সর্বশেষ সংযোজন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। অনেক সময় লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও এআই প্রযুক্তি ড্রোনকে নিজে থেকেই লক্ষ্যভেদে সহায়তা করে। ইউক্রেনীয় ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন ড্রোন তৈরির চেষ্টা করছে যা মানুষের সাহায্য ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআই এখন পর্যন্ত মানুষকে কেবল সহায়তা করছে, পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি।

প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের মাঝেও মানুষের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। সামরিক পর্যবেক্ষক ও সম্মুখভাগের যোদ্ধাদের মতে, ড্রোন বা এআই যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত ভূখণ্ড দখলের জন্য পদাতিক বাহিনীর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কারণ, কোনো এলাকায় পতাকা উড়িয়ে দখল নিশ্চিত করতে এখনো মানুষের বিকল্প তৈরি হয়নি। প্রযুক্তির এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সমীকরণ: চীন থেকে অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিসাইল কিনছে ইরান

রণক্ষেত্রে ড্রোনের একচ্ছত্র আধিপত্য: এআই ও প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের সমীকরণ

আপডেট সময় : ০১:৪৯:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ এই সময়ে যুদ্ধের চিরাচরিত ব্যাকরণ ও রণকৌশলে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এক সময়কার দাপুটে ট্যাংক বহর কিংবা বিশাল পদাতিক বাহিনীর পরিবর্তে বর্তমান রণক্ষেত্রে এখন ড্রোনের জয়জয়কার। আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে একটি যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে, ইউক্রেন এখন তার এক জীবন্ত উদাহরণ।

যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়ার বিশাল সেনাবাহিনী ও ভারী ট্যাংক বহর মূল শক্তি হলেও, বর্তমানে ছোট ও সস্তা ড্রোনই হয়ে উঠেছে প্রধান মরণাস্ত্র। ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধক্ষেত্রে বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতির মূলে রয়েছে ড্রোন। সম্মুখভাগের পরিস্থিতি এখন এতটাই বিপজ্জনক যে, প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য ‘কিল জোন’। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে এই এলাকায় কোনো কিছুর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ধরা পড়া এড়াতে সেনারা এখন বড় দলের বদলে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দ্রুত চলাচল করে এবং তাদের নজর থাকে সবসময় আকাশের দিকে। ভারী সাঁজোয়া যানগুলো ড্রোনের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় রসদ সরবরাহ বা আহতদের সরিয়ে নিতে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় স্থল-রোবট।

এই ড্রোন যুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করা। শুরুর দিকে রেডিও সিগন্যালে ড্রোন চালানো হলেও ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের কারণে তা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এর বিকল্প হিসেবে রুশ বাহিনী এখন অতি-পাতলা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বা তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার করছে, যা জ্যামিং প্রযুক্তিতে অচল করা অসম্ভব। এর ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদগুলো এখন তারের জালে ছেয়ে গেছে, যা কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়। অন্যদিকে, ইউক্রেনীয়রা স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা স্টারলিংক টার্মিনালের মাধ্যমে দূরপাল্লার ড্রোন পরিচালনা করছে। তবে সম্প্রতি রাশিয়ার অবৈধ টার্মিনালগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ফলে দুই পক্ষই নতুন করে কৌশল সাজাতে বাধ্য হচ্ছে।

ড্রোনের এই ব্যাপক বিস্তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এনেছে। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন ধ্বংস করতে লাখ লাখ ডলারের মিসাইল খরচ করা এখন অলাভজনক। এর বদলে তৈরি হচ্ছে ‘ইন্টারসেপ্টর ড্রোন’, যার কাজ হলো আকাশেই শত্রু ড্রোনকে আঘাত করা। এছাড়া ট্রাক ও সাঁজোয়া যানে বিশেষ জ্যামার এবং ড্রোন হামলা ঠেকাতে লোহার খাঁচা বা জালের ব্যবহার এখন সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।

প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে সর্বশেষ সংযোজন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। অনেক সময় লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও এআই প্রযুক্তি ড্রোনকে নিজে থেকেই লক্ষ্যভেদে সহায়তা করে। ইউক্রেনীয় ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন ড্রোন তৈরির চেষ্টা করছে যা মানুষের সাহায্য ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআই এখন পর্যন্ত মানুষকে কেবল সহায়তা করছে, পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি।

প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের মাঝেও মানুষের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। সামরিক পর্যবেক্ষক ও সম্মুখভাগের যোদ্ধাদের মতে, ড্রোন বা এআই যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত ভূখণ্ড দখলের জন্য পদাতিক বাহিনীর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কারণ, কোনো এলাকায় পতাকা উড়িয়ে দখল নিশ্চিত করতে এখনো মানুষের বিকল্প তৈরি হয়নি। প্রযুক্তির এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।