ঢাকা ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সীতাকুণ্ডে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব: জাল হারিয়ে নিঃস্ব জেলেদের বিক্ষোভ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১৯:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাগর উপকূলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় জেলেরা। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদ চত্বরে কয়েকশ জেলে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্রের ‘বালু দস্যুতার’ কারণে একদিকে যেমন কৃষি জমি বিলীন হচ্ছে, অন্যদিকে সাগরে জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিক্ষুব্ধ জেলেদের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘ দিন ধরে সাগরের তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এই বালু দিয়ে উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের প্রায় ১০০ একর কৃষি জমি ভরাট করা হয়েছে। ড্রেজারের পাইপ বসাতে গিয়ে অনেক স্থানে ফসলি জমি মাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই স্থানীয়দের কপালে জুটছে হুমকি ও ভয়ভীতি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জেলেরা; সাগরে জাল ফেললেই ড্রেজার ও বাল্কহেডের ধাক্কায় তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে প্রায় ২০০ জেলের ৮০০টি জাল নষ্ট হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জাল কেনা এসব জেলে এখন কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে, সৈয়দপুরের কথিত জামায়াত নেতা রায়হান উদ্দিন ও কুমিরার জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে ‘এমআর ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই বালু উত্তোলনের নেপথ্যে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের একটি কথিত অনুমতিপত্র দেখিয়ে তারা এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। এই চক্রের সাথে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতার নামও উঠে এসেছে, যারা প্রতি ফুট বালু থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত একটি তৈরি পোশাক কারখানার জমি ভরাটের লক্ষ্যেই এই ব্যাপক বালু উত্তোলন চলছে।

জেলেদের মধ্যে এখনও গত বছরের একটি বীভৎস স্মৃতি আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে। তারা জানান, গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাল কাটার প্রতিবাদ করায় রাম জলদাস নামের এক জেলেকে পিটিয়ে হত্যা করে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনার বিচার না পাওয়ায় এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ায় তারা নিরুপায় হয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। বিক্ষোভ শেষে জেলেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন।

পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতির বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাছিম বিল্লাহ জানান, নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে শুধু জেলেদের জালই নষ্ট হচ্ছে না, বরং সাগরের তলদেশের বাস্তুসংস্থান ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানির ঘোলাটে ভাব বেড়ে যাওয়ায় মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মৎস্য সম্পদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, “জেলেদের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তবে অভিযুক্ত বালু উত্তোলনকারী রায়হান উদ্দিন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, সৈয়দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কাজী এনামুল বারী জানিয়েছেন, বালু উত্তোলন বা কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং দলের কেউ পরিবেশ বিধ্বংসী কাজে জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মাঠের রাজা হলেও যে অপূর্ণতা আজও পোড়ায় মেসিকে

সীতাকুণ্ডে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব: জাল হারিয়ে নিঃস্ব জেলেদের বিক্ষোভ

আপডেট সময় : ০৬:১৯:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাগর উপকূলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় জেলেরা। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদ চত্বরে কয়েকশ জেলে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্রের ‘বালু দস্যুতার’ কারণে একদিকে যেমন কৃষি জমি বিলীন হচ্ছে, অন্যদিকে সাগরে জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিক্ষুব্ধ জেলেদের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘ দিন ধরে সাগরের তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এই বালু দিয়ে উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের প্রায় ১০০ একর কৃষি জমি ভরাট করা হয়েছে। ড্রেজারের পাইপ বসাতে গিয়ে অনেক স্থানে ফসলি জমি মাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই স্থানীয়দের কপালে জুটছে হুমকি ও ভয়ভীতি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জেলেরা; সাগরে জাল ফেললেই ড্রেজার ও বাল্কহেডের ধাক্কায় তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে প্রায় ২০০ জেলের ৮০০টি জাল নষ্ট হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জাল কেনা এসব জেলে এখন কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে, সৈয়দপুরের কথিত জামায়াত নেতা রায়হান উদ্দিন ও কুমিরার জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে ‘এমআর ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই বালু উত্তোলনের নেপথ্যে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের একটি কথিত অনুমতিপত্র দেখিয়ে তারা এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। এই চক্রের সাথে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতার নামও উঠে এসেছে, যারা প্রতি ফুট বালু থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত একটি তৈরি পোশাক কারখানার জমি ভরাটের লক্ষ্যেই এই ব্যাপক বালু উত্তোলন চলছে।

জেলেদের মধ্যে এখনও গত বছরের একটি বীভৎস স্মৃতি আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে। তারা জানান, গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাল কাটার প্রতিবাদ করায় রাম জলদাস নামের এক জেলেকে পিটিয়ে হত্যা করে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনার বিচার না পাওয়ায় এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ায় তারা নিরুপায় হয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। বিক্ষোভ শেষে জেলেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন।

পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতির বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাছিম বিল্লাহ জানান, নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে শুধু জেলেদের জালই নষ্ট হচ্ছে না, বরং সাগরের তলদেশের বাস্তুসংস্থান ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানির ঘোলাটে ভাব বেড়ে যাওয়ায় মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মৎস্য সম্পদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, “জেলেদের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তবে অভিযুক্ত বালু উত্তোলনকারী রায়হান উদ্দিন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, সৈয়দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কাজী এনামুল বারী জানিয়েছেন, বালু উত্তোলন বা কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং দলের কেউ পরিবেশ বিধ্বংসী কাজে জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।