প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান মিশরের বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩৫ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীও রয়েছেন, যারা আবাসিক ও অনাবাসিক উভয় প্রকারেই অধ্যয়ন করছেন। পবিত্র রমজান মাসে, এই শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছেই ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদ এক বিশেষ ইফতারগাহে পরিণত হয়েছে।
এই বছর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এক মহতী উদ্যোগে প্রতিদিন প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য আল-আজহার মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। আসরের আজান ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা মসজিদের পূর্ব পাশের গেট দিয়ে সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করেন। পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পর তাদের অনুমতিসূচক টোকেন প্রদান করা হয়, যা নিয়ে তারা মসজিদে প্রবেশ করে নির্ধারিত নিয়মে ইফতারে অংশ নেন।
সুউচ্চ মিনার বেষ্টিত প্রাচীন এই মসজিদের অভ্যন্তরে বিরাজ করে এক প্রশান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ। কাঠের বিভাজনে বিভক্ত অংশে নারী শিক্ষার্থীরা ইফতার ও নামাজ আদায় করেন। খোলা উঠানে, সাদা টাইলসের উপর, নামাজ শেষে অনেকেই কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকেন, কেউ বা তাসবিহ পাঠে ব্যস্ত—সব মিলিয়ে এক অনুপম আধ্যাত্মিক দৃশ্যপট তৈরি হয়।
আল-আজহারের আন্ডার সেক্রেটারি ড. মুহাম্মাদ আল-দুওয়াইনি-র প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই ইফতার আয়োজন পরিচালিত হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ের আগেই নিঃশব্দে ইফতার সামগ্রী পরিবেশনের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। মাগরিবের আজানের প্রায় ৩০ মিনিট পূর্বে শিক্ষার্থীদের ইফতার সামনে নিয়ে বসার নির্দেশ দেওয়া হয়। আজানের ঠিক আগ মুহূর্তে একজন ক্বারী সুমিষ্ট সুরে কোরআন তেলাওয়াত করে এক পবিত্র আবহ তৈরি করেন।
আজান ধ্বনিত হওয়ার সাথে সাথে খেজুর ও পানি দিয়ে শিক্ষার্থীরা ইফতার শুরু করেন, এরপরই তারা নামাজে দাঁড়িয়ে যান। নামাজ শেষে পরিবেশিত হয় মূল খাবার। ইফতারের মেন্যুতে থাকে মিশরের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পদ, যার মধ্যে খেজুর, জুস, ভাত, স্থানীয় রুটি ‘ঈশ বালাদি’, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, কোপ্তা, সবজি এবং সুস্বাদু মিশরীয় মিষ্টান্ন উল্লেখযোগ্য।
আল-আজহারে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শেরপুরের আবু সাওবান আকন্দ জানান, মাতৃভূমি, পরিবার এবং প্রিয়জনদের ছেড়ে বিদেশের মাটিতে রমজান কাটানো এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সেহরি ও ইফতারের সময় পরিবারকে খুব মনে পড়ে, বিশেষ করে দেশীয় ইফতার সামগ্রীর কথা। তবে তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো শিক্ষার্থীর সঙ্গে একত্রে ইফতার করার অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ। এই মহতী উদ্যোগের জন্য তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
রমজানের এই সম্মিলিত ইফতার আয়োজন কেবল খাদ্য ভাগাভাগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে আগত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা এবং গভীর আধ্যাত্মিক বন্ধন গড়ে তোলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
—
রিপোর্টারের নাম 























