একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের করের অর্থে পরিচালিত সরকারের প্রতিটি ব্যয়ই মূলত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সামষ্টিক অর্থনীতির পরিমাপক জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে সরকারি ব্যয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যয় জিডিপির ২০-২৫ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এর হার প্রায় ১৮ শতাংশ। তবে ব্যয়ের এই অংক কেবল সংখ্যাগত নয়, বরং এর গুণগত মানের ওপরই নির্ভর করে একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি ব্যয় মূলত দুই ধরনের—পণ্য ও সেবা ক্রয় এবং হস্তান্তর দেনা (ভর্তুকি বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি)। হস্তান্তর দেনা সরাসরি জিডিপিতে যুক্ত না হলেও এটি সমাজের আয়বৈষম্য কমাতে এবং প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে এই ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা বা স্বচ্ছতার অভাব থাকলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এই পরিস্থিতিকে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা ‘মিত্রপক্ষের গুলি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন ভুলবশত নিজের সেনার গুলিতে সহযোদ্ধা নিহত হয়, তেমনি অপরিকল্পিত সরকারি ব্যয়ও উপকারের বদলে জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ‘আত্মঘাতী ব্যয়ের’ বেশ কিছু উদাহরণ দৃশ্যমান। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বড় বড় প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরও রক্ষণাবেক্ষণ বা সংযোগ সড়কের অভাবে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন, পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পের পর নদী শাসন ও নাব্যতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী সড়কগুলোর উপযোগিতা বজায় রাখতে যে বিপুল ব্যয় হচ্ছে, তা সঠিক পরিকল্পনার অভাবকেই নির্দেশ করে। একইভাবে, নদীমাতৃক এই দেশে অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণের ফলে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ রেলওয়ের মতো সাশ্রয়ী যোগাযোগ মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও সেখানে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
সামাজিক খাতের চিত্রটিও উদ্বেগজনক। শিক্ষা খাতে শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের চেয়ে প্রাইভেট কোচিংয়ে বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র; সরকারি হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেও চিকিৎসকদের একটি অংশ ব্যক্তিগত চেম্বারে সময় দিচ্ছেন। ফলে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন প্রদান করা হলেও সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে আবারও পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এটি মূলত সরকারি ব্যয়ের উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিচ্ছে।
ভর্তুকি ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট। কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দেওয়া ভর্তুকি অনেক সময় প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায় না। রাজনৈতিক প্রভাবে স্বল্প সুদের ঋণ বিতরণ করা হলেও তা আদায়ের হার হতাশাজনক। আবার উচ্চ সুদে বিদেশি ঋণ নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থায়ন করাকে বিশ্লেষকরা অবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করেন। বিদ্যুৎ খাতে ‘কুইক রেন্টাল’ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা করা হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে এবং টেকসই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক ধরনের বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় ক্ষুধার হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদকরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তেমনি ভোক্তারাও উচ্চমূল্যের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন। এই ভারসাম্যহীনতা প্রমাণ করে যে, কেবল ব্যয় বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং ব্যয়ের সঠিক বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, একটি উন্নয়নকামী দেশের জন্য সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি অপরিহার্য। তবে সেই ব্যয় যাতে ‘আত্মঘাতী’ না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্রতিটি প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মূল্যায়ন, তদারকি এবং দুর্নীতিরোধ নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় ও আত্মঘাতী ব্যয় কমিয়ে আনাই হোক আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য।
রিপোর্টারের নাম 























