জুলাই বিপ্লবের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষস্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বুধবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করে এই জবানবন্দিকে সাক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য, এই মামলার সকল আসামি পলাতক।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ ও জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া বদরউদ্দিন ওমরের জবানবন্দিও সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
গত বছরের ১৮ জুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে শহীদ শরীফ ওসমান হাদী বলেন, তিনি ছোটবেলায় ঝালকাঠি শহরের ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন এবং আলিম পাশ করে ঢাকায় আসেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ সেশনে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
জবানবন্দিতে হাদী নিজেকে একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যখনই সুযোগ এসেছে, কবিতা, গল্প, গান বা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে একজন শরীক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করেন। তার মতে, এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, যার সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে।
শরীফ ওসমান হাদী তার জবানবন্দিতে আরও বলেন, বিসিএস নবম ও দশম গ্রেডের ৫৪ শতাংশেরও বেশি পদ বিভিন্ন কোটার মাধ্যমে দখল করা ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন ছিল, শেখ হাসিনা সরকার বিভিন্ন কোটা প্রবর্তন করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করেছে। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ হওয়ার কারণে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ তৈরির হিড়িক পড়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা সরকার আদালতকে প্রভাবিত করে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার সংক্রান্ত পরিপত্র বাতিল করে দিয়েছিল, যার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও কোনো ফল আসেনি। বঙ্গভবনে স্মারকলিপি দিলেও কোনো কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়নি।
হাদী বলেন, গত ১৪ জুলাই আন্দোলন যখন জোরালো হয়, তখন শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ ও ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে আখ্যায়িত করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সারাদেশের শিক্ষার্থীরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হলের গেট ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে এবং ‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ স্লোগান দিতে থাকে। সেদিন তিনি তার বন্ধুকে নিয়ে রামপুরা থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়ার চেষ্টা করলে কাকরাইল ও মৎস্য ভবনের সামনে রামদা, পিস্তল, চাপাতি, রড, হকিস্টিকসহ যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অবস্থান দেখতে পান। তিনি তার ছোট ভাই সমন্বয়ক আক্তারকে ফোন করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা জানিয়ে দ্রুত কর্মসূচি শেষ করার অনুরোধ করেন।
জবানবন্দিতে হাদী অভিযোগ করেন, সেদিন যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের নেতৃত্বে মিছিল করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই শুধু গুলি করেনি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী সন্ত্রাসীবাহিনীর হাতেও আন্দোলনকালীন সময়ে বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছে। নিখিলের হাতে অস্ত্র নিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে, এবং কুমিল্লা দেবীদ্বারে একজন সংসদ সদস্যকে নিজে গুলি লোড করতে দেখা গেছে।
ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে হাদী বলেন, ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর তিনি বলেন, আন্দোলন দমনের জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে তিনি অস্ত্রবিহীন একটি ছাত্র সংগঠনকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর লেলিয়ে দিয়ে হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। ১৮ জুলাই কারফিউ জারির বিষয়ে ১৪ দলের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকের পর গণমাধ্যমকর্মীরা প্রশ্ন করলে তিনি ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান। হাদী মনে করেন, এই নির্দেশ শুধু প্রশাসনকে নয়, দলীয় সন্ত্রাসীদেরও দেওয়া হয়েছিল।
জুলাইয়ের শেষের দিকে শহীদদের পরিচয় পর্যালোচনা করে হাদী বলেন, তখন রিকশাচালক, দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী, শ্রমিক, শিশুসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শহীদ হয়েছেন। অর্থাৎ, আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ১৭ বছরে গুম, ক্রসফায়ার ও কারাবন্দী হওয়া মানুষের স্বজনরাও রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।
হাদী আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় থেকে ওবায়দুল কাদের মহানগর থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ৪ আগস্ট ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি জেলায় অস্ত্র হাতে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, ওবায়দুল কাদের দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তার বক্তব্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের ওপর। নাসিমকে দলের দ্বিতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে ছিল, কারণ ইনান ছিলেন তার রিক্রুট। হাদী বলেন, নাসিম প্রত্যেকটি গণহত্যাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বাস্তবায়ন করেছেন এবং শেখ হাসিনার কাছে রিপোর্ট করতেন।
১৪ জুলাই যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে গিয়েছিল, তখন মোহাম্মদ আলী আরাফাত প্রক্টোরিয়াল টিমের অনুমতি ছাড়াই যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে হুমকি-ধমকি দেন। আরাফাত তথ্য সন্ত্রাস ছড়িয়ে বহু মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগ করেন হাদী। শহীদ আবু সাঈদকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হলে আরাফাত তাদের ‘মাদকাসক্ত’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশের বিষয়ে হাদী বলেন, শেখ হাসিনার আত্মীয় এবং মেয়র তাপসের বড় ভাই হওয়ার সুবাদে তিনি অনেক মন্ত্রীর চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর ছিলেন। ঢাকার দখলবাজি ও হত্যাকাণ্ডে যুবলীগের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর যে হামলা হয়েছিল, সেটি তার নির্দেশেই হয়েছিল। সারাদেশে উসকানি দিয়ে তিনি তার দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নেতৃত্বে ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল হয়েছিল। নিখিল সারাদেশে তার বাহিনী দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। মিরপুরের বাসিন্দা হওয়ায় মিরপুরে আন্দোলন চলাকালে তিনি অন্যান্য সংসদ সদস্যদের দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন হাদী।
ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ১৪ জুলাই রাতে ছাত্রলীগ ও বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করেন। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের তার নেতৃত্বে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। এছাড়াও তিনি রাজু ভাস্কর্যে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের ‘দেখে নেওয়ার’ এবং তাদের জীবন ‘তছনছ করে দেওয়ার’ হুমকি দেন। ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে তিনি সারাদেশে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের হত্যা করার বৈধতা দিয়েছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যার মূল হোতা তিনিই ছিলেন।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’ করার কথা বললেও, সেদিন তিনি আন্দোলনরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গেস্ট রুমে ডেকে ভয়ংকরভাবে হুমকি দিয়েছিলেন। এমনকি আন্দোলনকারী ছাত্রীদের অভিভাবকদের ফোন করে ভয় দেখিয়েছিলেন, যার ফলে পরদিনই কিছু অভিভাবক তাদের মেয়েদের নিয়ে যান। ১৭ জুলাই ইনান কীভাবে হত্যা করা হবে, কীভাবে আন্দোলন দমন করা হবে, সে বিষয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, যার কল রেকর্ড আল জাজিরা মিডিয়ার মাধ্যমে শোনা গেছে। হাদী অভিযোগ করেন, ইনান ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন। তাকে অসংখ্য নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে তিনি শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
শহীদ ওসমান হাদী তার জবানবন্দির শেষ অংশে সারাদেশে আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত পরিকল্পিত গণহত্যাকাণ্ডসহ বর্বরোচিত হামলার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ ঘটনায় জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, দ্রুত এদের বিচার না হলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভবিষ্যতে কী পরিমাণ গণহত্যা চালাবে তা অকল্পনীয় এবং তাদের বিচারের আওতায় না আনলে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 

























