ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। তবে নতুন সরকারের এই যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ নয়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তাঁদের। এই প্রেক্ষাপটে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
সাক্ষাৎকারে ড. মোস্তাফিজুর রহমান নতুন সরকারের সামনে থাকা প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোকে মূলত চারটি স্তরে ভাগ করেছেন:
১. তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা: বর্তমানে দেশে বিনিয়োগের গতি নিম্নমুখী এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার অত্যন্ত দুর্বল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি এবং আস্থার সংকটের কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। নতুন সরকারকে শুরুতেই এই আস্থার সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে হবে।
২. সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতা: ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব প্রশাসন এবং পুঁজিবাজারের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিগত সময়ে যেসব সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো মাঝপথে থামিয়ে না দিয়ে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছানো জরুরি। নীতির ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে সংস্কারের সুফল পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ (Tk 6 lakh crore+) আদায় করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে।
৩. এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এ পর্যন্ত পাওয়া বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার সুবিধাগুলো আর থাকবে না। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো নতুন নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে জড়াচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশকে নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে টিকে থাকতে হবে। এজন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা অপরিহার্য।
৪. নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও রাজস্ব আহরণ: বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো—যেমন সর্বজনীন মিডডে মিল, ফ্যামিলি কার্ড এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি—বাস্তবায়ন করতে হলে বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত কম। তাই প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা ছাড়া এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হবে না।
বাজেট ও সুশাসন নিয়ে পরামর্শ: ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন সরকারের প্রথম বড় নীতিগত বার্তা হবে তাদের প্রথম বাজেট। তিনি পরামর্শ দেন যে, সরকারকে কেবল অবকাঠামো নয়, বরং মানুষের ওপর বিনিয়োগের গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের ওপর অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা কমানো উচিত। একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান, যাতে একটি জবাবদিহিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
রিপোর্টারের নাম 























