পবিত্র রমজান মাসে সংযম ও ইবাদতের মাধ্যমে মুসলমানরা আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটেন। এই সময়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা যেমন বাড়ে, তেমনি রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা গ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে নাক-কান-গলার (ইএনটি) কোনো সমস্যায় পড়লে রোজা রেখে চিকিৎসা গ্রহণ করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই সংশয়ে ভোগেন। নাকের স্প্রে, কানের ড্রপ, গড়গড়া কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন রোজার ওপর প্রভাব ফেলবে কিনা—এই জরুরি প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শরিয়াহর আলোকে এই বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানা থাকলে রমজানে চিকিৎসা গ্রহণ আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
টনসিল প্রদাহ ও গলার সংক্রমণ
টনসিল প্রদাহ বা গলার ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। রমজানে রোগীরা যাতে রোজা রেখেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য চিকিৎসকরা এমন অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করেন যা দিনে একবার বা দুবার সেবন করলেই কার্যকর হয়। এতে ইফতার ও সাহরির সময় ওষুধ গ্রহণ করে চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রয়োজনে ওষুধের ডোজ ও সময়সূচিও সামঞ্জস্য করে নেওয়া যায়। শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন গ্রহণ করা রোজার জন্য ক্ষতিকর নয়, তবে শক্তিবর্ধক কোনো কিছু (যেমন স্যালাইন) শিরায় দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
রোজা অবস্থায় গড়গড়া করার বিষয়ে সতর্কতা
গলাব্যথা, টনসিল প্রদাহ কিংবা মুখের দুর্গন্ধের কারণে অনেকে দিনের বেলায় লবণ-পানি বা ওষুধমিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করতে চান। কিন্তু রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় গড়গড়া করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। এর কারণ হলো, গড়গড়া করার সময় অসাবধানতাবশত সামান্য পরিমাণ তরলও যদি গলা দিয়ে পাকস্থলীতে চলে যায়, তবে রোজা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দিনের বেলায় গড়গড়া পরিহার করে ইফতারের পর বা সাহরির সময় এই কাজটি করা যেতে পারে। এতে গলার পরিচর্যাও হবে এবং রোজার পবিত্রতাও বজায় থাকবে।
সাইনোসাইটিস ও নাকের সমস্যা
সাইনোসাইটিসের কারণে নাক বন্ধ থাকা, মাথাব্যথা বা নাক দিয়ে পুঁজ পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে নাকের ড্রপ বা স্প্রে ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় নাকে ওষুধ প্রয়োগ করলে তা নাক দিয়ে গলা হয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই সাহরির সময় ও ইফতারের পর নাকের ড্রপ বা স্প্রে ব্যবহার করাই নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। চিকিৎসক প্রয়োজনে ওষুধের মাত্রা ও সময়সূচি পরিবর্তন করে দিতে পারেন। এছাড়া, পানিস্বল্পতার কারণে মাইগ্রেনের তীব্রতা বাড়তে পারে, তাই মাইগ্রেনের রোগীদের ইফতার ও সাহরির সময়ে পর্যাপ্ত পানি পানের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।
কান পাকা ও কানের অন্যান্য রোগ
কান পাকা বা কানের যেকোনো সংক্রমণে কানের ড্রপ ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কানে ওষুধ দিলে রোজা ভাঙে না। কিন্তু অনেক রোগীর কানের পর্দায় (ইয়ারড্রাম) ছিদ্র থাকতে পারে। এমন অবস্থায় কানে দেওয়া তরল ওষুধ কানের সঙ্গে নাকের সংযোগকারী টিউব দিয়ে ভেতরের পথে গলা পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই রোজা থাকা অবস্থায় দিনের বেলায় কানে ড্রপ ব্যবহার না করে সাহরি ও ইফতারের পর ব্যবহার করাই অধিক নিরাপদ ও সতর্কতামূলক।
রোজা ভঙ্গের বিষয়ে শরিয়াহর দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে পাকস্থলীতে কোনো কিছু প্রবেশ করালে রোজা ভেঙে যায়। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘নাকে পানি দেওয়ার সময় ভালোভাবে পানি পৌঁছাবে, তবে রোজা থাকলে অতিরিক্ত করবে না।’ (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি, সহিহ)। এই হাদিসের আলোকে আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, নাক এমন একটি পথ যার মাধ্যমে কোনো কিছু পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারে। তাই রোজা অবস্থায় নাক দিয়ে কোনো তরল প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকা উচিত।
উপসংহার
রমজানে নাক-কান-গলার যেকোনো চিকিৎসা গ্রহণ করা সম্ভব, তবে তা হতে হবে সুপরিকল্পিত ও সচেতনভাবে। চিকিৎসক ও রোগীর সমন্বয়ের মাধ্যমেই এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়, যাতে রোগ নিরাময় হয় এবং রোজার পবিত্রতাও অক্ষুণ্ণ থাকে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ শরীর ইবাদতের সহায়ক। তাই রমজানে চিকিৎসা ও ইবাদত—দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
রিপোর্টারের নাম 




















