ঢাকা ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন ও উদীয়মান সমীকরণ: ২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন মানচিত্র

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১০:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরেছে বিএনপি। তবে এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি দলের জয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূগোলে এক গভীর ও বহুমাত্রিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বুঝতে গেলে বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের ‘আ টেল অব টু সিটিস’ উপন্যাসের সেই চিরায়ত দর্শনের কথা মনে পড়ে, যেখানে বিপ্লব, প্রতিশোধ এবং আত্মত্যাগের দ্বৈত সত্য পাশাপাশি অবস্থান করে। উপন্যাসের নায়ক চার্লস ডারনে যেমন অতীতের দায়ভার কাঁধে নিয়ে ন্যায়ের পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপিকেও অতীতের স্মৃতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশার এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপির এই বিজয় যতটা না সাংগঠনিক, তার চেয়ে বেশি ‘সহানুভূতির পুঁজি’ ও ‘পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার’ ফসল। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের তত্ত্ব অনুযায়ী, রাজনৈতিক বৈধতা আসে ঐতিহ্য ও আইনি কাঠামো থেকে। বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক নির্বাসনের শিকার হওয়ায় জনমানসে এক ধরনের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই বিজয় একক আধিপত্যের পুরনো ছক ভেঙে দিয়েছে। নির্বাচনে জামায়াত জোটের ৭৭টি আসনে জয় এবং আরও অর্ধশতাধিক আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর দ্বিমেরু কেন্দ্রিক নয়। বরং এটি ‘কম্পিটিটিভ প্লুরালিজম’ বা প্রতিযোগিতামূলক বহুত্ববাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান কারিগর হলো তরুণ প্রজন্ম। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ‘ওপেন ফিল্ড মোমেন্ট’ বা উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তরুণরা নতুন এক রাজনৈতিক ভাষা খুঁজছে। তাদের কাছে রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা। জামায়াতের উল্লেখযোগ্য উত্থান এবং তরুণদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, সমাজ ও রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় ফিরলেও তরুণদের নিরঙ্কুশ সমর্থন ধরে রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, যদি না তারা সুশাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করতে পারে।

ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি প্রতিশোধের রাজনীতিতে জড়াবে, নাকি রাষ্ট্র সংস্কারে মন দেবে? ইতিহাসের শিক্ষা হলো, দীর্ঘ নিপীড়নের পর ক্ষমতায় আসা দলগুলো প্রায়ই প্রতিহিংসার ফাঁদে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। অন্যদিকে, বিরোধী অবস্থানে থাকা জামায়াতের জন্য এটি একটি ‘থ্রেশহোল্ড ক্রসিং’ বা মূলধারায় শক্তিশালী অবস্থানের মুহূর্ত। ডিকেন্সের গল্পের সিডনি কার্টনের মতো ক্ষমতার বাইরে থেকেও নৈতিক সংহতি ও জনসেবার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভবিষ্যতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রাম ও শহরের ভোটারদের প্রত্যাশায় ভিন্নতা থাকলেও একটি জায়গায় সবাই এক—তা হলো জুলাই সনদের নৈতিক অঙ্গীকার। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানবিক মর্যাদার যে দাবি রাজপথে উচ্চারিত হয়েছিল, তা পূরণ করাই এখন বিজয়ী ও বিজিত উভয় পক্ষের প্রধান দায়িত্ব। প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা বিএনপির জন্য যেমন অগ্নিপরীক্ষা, তেমনি বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা জামায়াতের জন্য এক বড় সুযোগ।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ক্ষমতা এখন আর কেবল ভোগের বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের আস্থা রক্ষার কঠিন দায়িত্ব। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে, যারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বৃহত্তর জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র ও প্রান্ত—উভয় পক্ষকেই প্রমাণ করতে হবে তারা কতটা জনবান্ধব ও দূরদর্শী। আস্থার এই লড়াইয়ে যারা উত্তীর্ণ হবে, তারাই আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন ও উদীয়মান সমীকরণ: ২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন মানচিত্র

আপডেট সময় : ১০:১০:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরেছে বিএনপি। তবে এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি দলের জয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূগোলে এক গভীর ও বহুমাত্রিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বুঝতে গেলে বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের ‘আ টেল অব টু সিটিস’ উপন্যাসের সেই চিরায়ত দর্শনের কথা মনে পড়ে, যেখানে বিপ্লব, প্রতিশোধ এবং আত্মত্যাগের দ্বৈত সত্য পাশাপাশি অবস্থান করে। উপন্যাসের নায়ক চার্লস ডারনে যেমন অতীতের দায়ভার কাঁধে নিয়ে ন্যায়ের পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপিকেও অতীতের স্মৃতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশার এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপির এই বিজয় যতটা না সাংগঠনিক, তার চেয়ে বেশি ‘সহানুভূতির পুঁজি’ ও ‘পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার’ ফসল। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের তত্ত্ব অনুযায়ী, রাজনৈতিক বৈধতা আসে ঐতিহ্য ও আইনি কাঠামো থেকে। বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক নির্বাসনের শিকার হওয়ায় জনমানসে এক ধরনের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই বিজয় একক আধিপত্যের পুরনো ছক ভেঙে দিয়েছে। নির্বাচনে জামায়াত জোটের ৭৭টি আসনে জয় এবং আরও অর্ধশতাধিক আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর দ্বিমেরু কেন্দ্রিক নয়। বরং এটি ‘কম্পিটিটিভ প্লুরালিজম’ বা প্রতিযোগিতামূলক বহুত্ববাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান কারিগর হলো তরুণ প্রজন্ম। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ‘ওপেন ফিল্ড মোমেন্ট’ বা উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তরুণরা নতুন এক রাজনৈতিক ভাষা খুঁজছে। তাদের কাছে রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা। জামায়াতের উল্লেখযোগ্য উত্থান এবং তরুণদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, সমাজ ও রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় ফিরলেও তরুণদের নিরঙ্কুশ সমর্থন ধরে রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, যদি না তারা সুশাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করতে পারে।

ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি প্রতিশোধের রাজনীতিতে জড়াবে, নাকি রাষ্ট্র সংস্কারে মন দেবে? ইতিহাসের শিক্ষা হলো, দীর্ঘ নিপীড়নের পর ক্ষমতায় আসা দলগুলো প্রায়ই প্রতিহিংসার ফাঁদে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। অন্যদিকে, বিরোধী অবস্থানে থাকা জামায়াতের জন্য এটি একটি ‘থ্রেশহোল্ড ক্রসিং’ বা মূলধারায় শক্তিশালী অবস্থানের মুহূর্ত। ডিকেন্সের গল্পের সিডনি কার্টনের মতো ক্ষমতার বাইরে থেকেও নৈতিক সংহতি ও জনসেবার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভবিষ্যতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রাম ও শহরের ভোটারদের প্রত্যাশায় ভিন্নতা থাকলেও একটি জায়গায় সবাই এক—তা হলো জুলাই সনদের নৈতিক অঙ্গীকার। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানবিক মর্যাদার যে দাবি রাজপথে উচ্চারিত হয়েছিল, তা পূরণ করাই এখন বিজয়ী ও বিজিত উভয় পক্ষের প্রধান দায়িত্ব। প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা বিএনপির জন্য যেমন অগ্নিপরীক্ষা, তেমনি বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা জামায়াতের জন্য এক বড় সুযোগ।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ক্ষমতা এখন আর কেবল ভোগের বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের আস্থা রক্ষার কঠিন দায়িত্ব। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে, যারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বৃহত্তর জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র ও প্রান্ত—উভয় পক্ষকেই প্রমাণ করতে হবে তারা কতটা জনবান্ধব ও দূরদর্শী। আস্থার এই লড়াইয়ে যারা উত্তীর্ণ হবে, তারাই আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠবে।