সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে দুটি ব্যালট পেপার ভোটারদের সামনে এক ভিন্নধর্মী সমীকরণ হাজির করেছিল। একদিকে ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেখানে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিশাল জয় পেয়েছে; অন্যদিকে ছিল প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর গণভোট, যেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে প্রায় একই রকম দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবধানে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যারা সংসদ নির্বাচনে জয়ী দলকে ভোট দিয়েছেন, তারাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক সিল মেরেছেন। কিন্তু ভোটের পরিসংখ্যান ও আসনভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এক গভীর ও জটিল চিত্র ফুটে ওঠে।
গণভোটে প্রায় ৩১ শতাংশ ভোটার সংস্কার প্রস্তাবের বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট দিয়েছেন। এই ‘না’ পন্থিদের রাজনৈতিক অবস্থান ও মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে তাদের প্রধানত চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
১. ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ ও দোসর গোষ্ঠী:
ভোটের চিত্রে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোতে ‘না’ ভোটের আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। সেখানে সংসদ সদস্য পদে বিজয়ীদের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে গণভোটে অংশ নেওয়া ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৫০ হাজার বেশি। অর্থাৎ, একটি বিশাল গোষ্ঠী কেবল ‘না’ ভোট দেওয়ার লক্ষ্যেই কেন্দ্রে গিয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, গোপালগঞ্জের প্রায় ৭২ শতাংশ ভোটার সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এছাড়া বৃহত্তর ফরিদপুর, মাদারীপুর ও আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মাদারীপুর-২ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতেছে মাত্র ৪০৬ ভোটের ব্যবধানে। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টিসহ ফ্যাসিবাদের সহযোগী দলগুলো আগে থেকেই ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাদের অনুসারীরাও এই ধারা বজায় রেখেছে। পার্বত্য তিন জেলাতেও ‘না’ ভোটের জয় জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়।
২. ধর্মীয় অপপ্রচার ও কওমি গোষ্ঠী:
চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ‘না’ ভোটের আধিক্যের পেছনে কাজ করেছে ধর্মীয় আবেগ ও অপপ্রচার। নির্বাচনের আগে কওমি আলেমদের একটি অংশ প্রচার চালিয়েছিল যে, সংস্কার প্রস্তাব বা ‘জুলাই সনদ’ অনুমোদিত হলে দেশ নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হবে। এমনকি বায়তুল মোকাররমের খতিবসহ প্রভাবশালী আলেমদের নেতিবাচক ইঙ্গিত সাধারণ ধর্মপ্রাণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে বলে ধারণা করা হয়। চট্টগ্রামের তিনটি আসনে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হলেও গণভোটে ‘না’ জয়লাভ করেছে। এর পেছনে যেমন ধর্মীয় প্রচারণা কাজ করেছে, তেমনি এস আলমের মতো পলাতক অলিগার্কদের অর্থ ও প্রভাব সংস্কারবিরোধী জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
৩. বিএনপির তৃণমূলের দ্বিধাদ্বন্দ্ব:
গণভোট নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডের অবস্থান তৃণমূল পর্যন্ত পরিষ্কার ছিল না। জুলাই সনদ নিয়ে দলটির কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা দ্বিমত থাকায় সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। যদিও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পরবর্তী সময়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে তৃণমূলের বড় একটি অংশ ‘না’ ভোট দেওয়াকেই দলীয় নীতি হিসেবে ধরে নেয়। ভোটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপির মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি ‘না’ তে সিল দিয়েছেন। ঝিনাইদহ-১ এবং নেত্রকোনা-৪ আসনের মতো জায়গায় বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হলেও সেখানে ‘না’ ভোট জয়লাভ করা একটি বড় বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. নব্য বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব:
বিগত এক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টকশোতে পরিচিতি পাওয়া একদল ‘গুপ্ত’ বুদ্ধিজীবী ও ইউটিউবার অনবরত জুলাই সনদের বিরোধিতা করে গেছেন। তাদের প্রভাবে বিএনপির সমর্থক ও তরুণ ভোটারদের একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়েছে। এই গোষ্ঠীটি গণভোটকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে প্রচার চালিয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বক্সে। এমনকি নির্বাচনের পরেও তাদের এই অবস্থান পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
উপসংহার:
গণভোটে ৬৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ার অর্থ হলো রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে জনগণের একটি বড় অংশের ম্যান্ডেট রয়েছে। তবে সংসদ নির্বাচনে ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়া বিএনপি এবং গণভোটে ৬৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের এই সাংঘর্ষিক পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে বিএনপির দ্বিমত ছিল, সেগুলো জনরায়ে অনুমোদিত হওয়ার পর এখন সংসদীয় বিতর্কে কোন পক্ষ জয়ী হয়, সেটিই দেখার বিষয়। এই ক্ষমতার ভারসাম্য ও জনমতের লড়াই আগামী দিনে রাজপথ ও সংসদ—উভয় জায়গাকেই উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 























