ঢাকা ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মালয়েশিয়ার প্রবাসে ক্যালিগ্রাফির তুলিতে শিল্পের আলো: ইয়াছিন ফরাজীর অনন্য গল্প

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৩৪:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমানো অসংখ্য মানুষের ভিড়ে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা শুধু কাজের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন না, বরং খুঁজে নেন নিজেদের স্বপ্ন আর ভালোবাসার নতুন দিগন্ত। মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. ইয়াছিন ফরাজী তেমনই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ, যিনি প্রবাসের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও একঘেয়ে জীবনেও শিল্পের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখেছেন। কঠিন বাস্তবতার মাঝেও ক্যালিগ্রাফির মতো সূক্ষ্ম শিল্পচর্চায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি শুধু আত্মিক প্রশান্তিই পাননি, অর্জন করেছেন সম্মান ও পরিচিতি।

কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গোয়ালমারি গ্রামের মো. জসিম উদ্দিন ফরাজীর সন্তান ইয়াছিন ফরাজী ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভাগ্য অন্বেষণে মালয়েশিয়ায় আসেন। প্রবাসে এসে নিয়মিত কাজ শুরু করলেও তার মনে সবসময় এক ধরনের শূন্যতা কাজ করত। গৎবাঁধা কাজের বাইরে সৃজনশীল কিছু করার অদম্য ইচ্ছা ছিল তার বহুদিনের, যদিও শুরুতে সেই ইচ্ছার কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা ছিল না। তার মনে হতো, জীবনটা শুধু কাজ আর ঘুমে আটকে থাকলে চলবে না।

মালয়েশিয়ায় আসার পর কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে তিনি বাংলা ও উর্দু ভাষায় শের (কবিতা) লিখতে শুরু করেন। লেখালেখির এই অভ্যাসই তাকে একদিন নতুন এক ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়। মনে হলো, লেখার হাতটা যদি আরও শানিত করা যায়! এই ভাবনা থেকেই ইউটিউবে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে তিনি প্রথম বিস্তারিতভাবে আরবি ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কে জানতে পারেন। এ সময় বাংলাদেশের প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফি শিল্পী উসামা হকের কাজ তার নজরে আসে। উসামা হকের শিল্পকর্ম ও শেখানোর পদ্ধতি তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণার ফলেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি উসামা হকের ক্যালিগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হন। এভাবেই শুরু হয় ইয়াছিন ফরাজীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়।

তবে এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম, কখনো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিউটি শেষ করেও তিনি ক্যালিগ্রাফি চর্চা চালিয়ে যেতেন। ক্লান্ত শরীর নিয়েও রাত জেগে অনুশীলন সবই ছিল স্বপ্নের টানে। কিন্তু এই শেখার মাঝপথেই নেমে আসে এক বড় ধাক্কা। কর্মক্ষেত্রে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় তার দুই হাতের আঙুলে মারাত্মক আঘাত লাগে। দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকার কারণে পেন্সিল বা তুলি ধরা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে কোর্স থেকেও তিনি অনেকটাই পিছিয়ে যান।

তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসার টানে তিনি আবারও ফিরে আসেন। আনন্দের বিষয় হলো, তার কাজ শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; মালয়েশিয়ার স্থানীয় নাগরিকরাও তার শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, একজন প্রবাসী শ্রমিক হয়েও কীভাবে তিনি এমন নিখুঁতভাবে এই শিল্প আয়ত্ত করেছেন। ইয়াছিন ফরাজীর জন্য সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন মসজিদে তার আঁকা ক্যালিগ্রাফি স্থান পেয়েছে। এটি তার কাছে শুধু স্বীকৃতিই নয়, বরং আত্মতৃপ্তির এক অনন্য উপলব্ধি।

ইয়াছিন ফরাজী তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “প্রবাস জীবনে কাজের চাপ থাকবেই। কিন্তু দিনশেষে যখন রং-তুলি হাতে নিই, তখন সব ক্লান্তি ভুলে যাই। এই শিল্পচর্চাই এখন আমার মানসিক প্রশান্তির সবচেয়ে বড় উৎস।” প্রবাসের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও ইয়াছিন ফরাজীর এই যাত্রা প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি আর ভালোবাসা থাকলে, দূরদেশেও নিজের স্বপ্নকে রঙিন করে তোলা সম্ভব। তার গল্প অসংখ্য প্রবাসীকে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে অনুপ্রাণিত করবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

মালয়েশিয়ার প্রবাসে ক্যালিগ্রাফির তুলিতে শিল্পের আলো: ইয়াছিন ফরাজীর অনন্য গল্প

আপডেট সময় : ০৭:৩৪:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমানো অসংখ্য মানুষের ভিড়ে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা শুধু কাজের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন না, বরং খুঁজে নেন নিজেদের স্বপ্ন আর ভালোবাসার নতুন দিগন্ত। মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. ইয়াছিন ফরাজী তেমনই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ, যিনি প্রবাসের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও একঘেয়ে জীবনেও শিল্পের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখেছেন। কঠিন বাস্তবতার মাঝেও ক্যালিগ্রাফির মতো সূক্ষ্ম শিল্পচর্চায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি শুধু আত্মিক প্রশান্তিই পাননি, অর্জন করেছেন সম্মান ও পরিচিতি।

কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গোয়ালমারি গ্রামের মো. জসিম উদ্দিন ফরাজীর সন্তান ইয়াছিন ফরাজী ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভাগ্য অন্বেষণে মালয়েশিয়ায় আসেন। প্রবাসে এসে নিয়মিত কাজ শুরু করলেও তার মনে সবসময় এক ধরনের শূন্যতা কাজ করত। গৎবাঁধা কাজের বাইরে সৃজনশীল কিছু করার অদম্য ইচ্ছা ছিল তার বহুদিনের, যদিও শুরুতে সেই ইচ্ছার কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা ছিল না। তার মনে হতো, জীবনটা শুধু কাজ আর ঘুমে আটকে থাকলে চলবে না।

মালয়েশিয়ায় আসার পর কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে তিনি বাংলা ও উর্দু ভাষায় শের (কবিতা) লিখতে শুরু করেন। লেখালেখির এই অভ্যাসই তাকে একদিন নতুন এক ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়। মনে হলো, লেখার হাতটা যদি আরও শানিত করা যায়! এই ভাবনা থেকেই ইউটিউবে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে তিনি প্রথম বিস্তারিতভাবে আরবি ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কে জানতে পারেন। এ সময় বাংলাদেশের প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফি শিল্পী উসামা হকের কাজ তার নজরে আসে। উসামা হকের শিল্পকর্ম ও শেখানোর পদ্ধতি তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণার ফলেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি উসামা হকের ক্যালিগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হন। এভাবেই শুরু হয় ইয়াছিন ফরাজীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়।

তবে এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম, কখনো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিউটি শেষ করেও তিনি ক্যালিগ্রাফি চর্চা চালিয়ে যেতেন। ক্লান্ত শরীর নিয়েও রাত জেগে অনুশীলন সবই ছিল স্বপ্নের টানে। কিন্তু এই শেখার মাঝপথেই নেমে আসে এক বড় ধাক্কা। কর্মক্ষেত্রে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় তার দুই হাতের আঙুলে মারাত্মক আঘাত লাগে। দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকার কারণে পেন্সিল বা তুলি ধরা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে কোর্স থেকেও তিনি অনেকটাই পিছিয়ে যান।

তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসার টানে তিনি আবারও ফিরে আসেন। আনন্দের বিষয় হলো, তার কাজ শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; মালয়েশিয়ার স্থানীয় নাগরিকরাও তার শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, একজন প্রবাসী শ্রমিক হয়েও কীভাবে তিনি এমন নিখুঁতভাবে এই শিল্প আয়ত্ত করেছেন। ইয়াছিন ফরাজীর জন্য সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন মসজিদে তার আঁকা ক্যালিগ্রাফি স্থান পেয়েছে। এটি তার কাছে শুধু স্বীকৃতিই নয়, বরং আত্মতৃপ্তির এক অনন্য উপলব্ধি।

ইয়াছিন ফরাজী তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “প্রবাস জীবনে কাজের চাপ থাকবেই। কিন্তু দিনশেষে যখন রং-তুলি হাতে নিই, তখন সব ক্লান্তি ভুলে যাই। এই শিল্পচর্চাই এখন আমার মানসিক প্রশান্তির সবচেয়ে বড় উৎস।” প্রবাসের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও ইয়াছিন ফরাজীর এই যাত্রা প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি আর ভালোবাসা থাকলে, দূরদেশেও নিজের স্বপ্নকে রঙিন করে তোলা সম্ভব। তার গল্প অসংখ্য প্রবাসীকে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে অনুপ্রাণিত করবে।