ঢাকা ০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জামায়াতের উত্থান, নাকি খারাপ ফল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৮:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

## জাতীয় সংসদে জামায়াতের উত্থান: নতুন মেরুকরণ নাকি ক্ষণস্থায়ী ঝলক?

ঢাকা: ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নতুন মোড় নিয়েছে। এই নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অপ্রত্যাশিত উত্থান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে জামায়াতের এই সাফল্য-ব্যর্থতা কেবল একটি দলের পারফরম্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান, পূর্বাঞ্চলে দুর্বলতা:

জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করেছে। দলটি এককভাবে ৩১.৭৬% এবং জোটবদ্ধভাবে প্রায় ৩৮.৫০% ভোট পেয়েছে, যা তাদের জোটের আসনসংখ্যা ৭৭-এ পৌঁছে দিয়েছে। তবে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসনসংখ্যা কম বলে মনে করছেন অনেকে।

নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রংপুর, রাজশাহী এবং খুলনা এই তিন বিভাগ নিয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চলের ১০৮টি আসনের মধ্যে দলটি প্রায় ১০০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এককভাবে ৫২টি আসনে জয়লাভ করেছে। রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের মধ্যে ১৮টি, রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে ১১টি এবং খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে ২৫টিতে তারা বিজয়ী হয়েছে। এই তিন বিভাগেই জামায়াতের এই চমকপ্রদ ফলাফল ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য এক নতুন বার্তা বহন করছে।

তবে দেশের অন্যান্য প্রধান আসন সংখ্যাবহুল বিভাগগুলোতে জামায়াত আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। বিশেষ করে, রংপুর বিভাগের দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী আসনগুলোতে দলটি সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও কোনো আসন পায়নি। অতীতে এই আসনগুলোতে জামায়াতের উপস্থিতি ছিল শক্তিশালী। সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন আদায়ের যে আশা জামায়াত করেছিল, তা এই দুই জেলায় সফল হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়। যদিও এই জেলাগুলোতে প্রায় ৩০% সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে, এমনকি খুলনা অঞ্চলেও দলটির একমাত্র সংখ্যালঘু প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন।

শহুরে মধ্যবিত্তের আস্থা অর্জন এবং ঢাকার রাজনীতিতে প্রভাব:

জামায়াতে ইসলামী অতীতের নির্বাচনে কখনোই ঢাকা শহরের কোনো আসনে বিজয়ী হতে পারেনি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে তারা জয়লাভ করেছে। এছাড়া, তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আরও একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে, এবং আরও চারটি আসনে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। নিজেদের নির্বাচনী ইতিহাসে এই প্রথম ঢাকা মহানগরে আসন জিততে সক্ষম হয়েছে জামায়াত।

জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণার সুফল জামায়াতকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা এই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল, তারা জামায়াতকে পরিবর্তনের একটি প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। এনসিপির সাথে জোট গঠনও তাদের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। ফলে, ঢাকায় চমক দেখাতে সক্ষম হয়েছে জামায়াত।

এছাড়া, গাজীপুর এবং ফরিদপুর-এ একটি করে আসনে জয়ী হওয়া প্রমাণ করে যে শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে জামায়াতের প্রতি আস্থা বেড়েছে। এমনকি গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় দলটির প্রার্থী অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। জামায়াত যদি ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আরও মনোযোগ দেয়, তবে ভবিষ্যতে তারা এখানে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্যও রাজধানীর ভোটারদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পলিসি সামিট ও ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা কর্মসূচির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে ঢাকার ভোটারদের প্রভাবিত করতে জামায়াত সক্ষম হয়েছে।

চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে দুর্বলতা এবং কওমি আলেমদের প্রভাব:

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য কোনো আসন পায়নি। এসব এলাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি জামায়াতের প্রভাবাধীন এলাকা থেকেও আসন পেয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালী ও টেকনাফের মতো অতীতে জামায়াতের দখলে থাকা আসনগুলোতেও এবার তারা পরাজিত হয়েছে। চট্টগ্রামে ১৬টি আসনের মধ্যে মাত্র দুটি এবং সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জামায়াত কোনো আসন জিততে পারেনি। চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৮টি আসনের মধ্যে ৪২টিতে লড়ে মাত্র তিনটিতে জয়লাভ করেছে দলটি। অর্থাৎ, দেশের পূর্বাঞ্চলের ৭৭টি আসনে জামায়াতের অর্জন মাত্র তিনটি আসন।

চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে জামায়াতের দুর্বল ফলের একটি বড় কারণ হিসেবে কওমি আলেমদের ব্যাপক প্রভাব এবং তাদের সরাসরি বিরোধিতা করাকে উল্লেখ করা হচ্ছে। এছাড়া, মাজারপন্থি এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন না পাওয়ায় ভোটের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এলাকায় বিএনপির ভোট প্রাপ্তি এবং জাতীয় পার্টির ভরাডুবি:

দেশের মধ্যাঞ্চল ও ময়মনসিংহ বিভাগ, যা মূলত আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানেও জামায়াত তেমন কোনো আসন পায়নি। তবে, ময়মনসিংহ বিভাগে প্রথমবারের মতো তিনটি আসনে জয়ী হওয়াকে জামায়াতের জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। জামায়াত নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোট একচেটিয়াভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতীক ধানের শীষে যাওয়ায় এসব আসনে জামায়াত জোট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জিততে পারেনি।

অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলে জামায়াতের উত্থানের ফলে জাতীয় পার্টির কার্যত ভরাডুবি হয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামল থেকে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগে এবার লাঙ্গল প্রতীক কোনো আসনেই জয়ী হতে পারেনি। লালমনিরহাট বাদে এই বিভাগের বাকি ১৯টি আসনের মধ্যে ১৮টিতেই জিতেছে জামায়াত জোট। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুরের একটি আসনে তৃতীয় হয়েছেন এবং দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধার দুটি আসনে নির্বাচন করে একটিতে জামানত হারিয়েছেন। এই বিপর্যয়কে জামায়াতের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ এবং ডা. শফিকের গণমুখী নেতৃত্ব:

জাতীয় নির্বাচনে বেশ কয়েকজন তরুণ শিবির নেতা বিজয়ী হয়েছেন, যা জামায়াতে ইসলামীতে তরুণ নেতৃত্বের প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। ছাত্রশিবিরের সাতজন সাবেক সভাপতিসহ বেশ কয়েকজন তরুণ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কোনো নেতাকে প্রার্থী করতে না পারা এবং এনসিপির তরুণ নেতাদের সাফল্য জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচনে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ক্যারিশমা দেখিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি একটি ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে সাধারণ মানুষের দলে রূপান্তর করে দেশের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত করেছেন। তার গণমুখী নেতৃত্ব এবং নির্বাচনি প্রচারণা সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। যদিও নারী ইস্যুতে তার কিছু বক্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ইসলামপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়।

ভবিষ্যতের রাজনীতিতে জামায়াতের প্রভাব:

নির্বাচনি ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকা সত্ত্বেও বিএনপি সহজ জয় পায়নি। দুইশোর বেশি আসন পেলেও এবারের নির্বাচনে অন্তত ৫০টি আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে মাত্র ১০ হাজারের কম ভোট ব্যবধানে। পাশাপাশি পাঁচ হাজারের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে ২১টি আসনে। রাজধানীর অন্তত চারটি আসন জামায়াত প্রার্থীরা মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।

অতীতে জামায়াত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ ছিল এবং সর্বোচ্চ ৩০টি আসনে নির্বাচন করে ১৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছিলো। এবার জামায়াতের নেতৃত্বে জোট গঠিত হয়েছে এবং জোটবদ্ধ দল থেকে ৯ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা জোট রাজনীতির একটি সফল উদাহরণ।

জামায়াতে ইসলামী জোট ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিএনপির মূল ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরেছে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ সংখ্যালঘু ও আওয়ামী সমর্থকদের বড় অংশের ভোট পেয়েছে বিএনপি। সেদিক দিয়ে জামায়াতের এই বিশাল ভোটপ্রাপ্তি দলটির বড় আকারের উত্থান হিসেবে দেখা যায়। এনসিপি ও ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে এই জোট টেকসই হলে আগামী দিনের ভোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, অল্প সময়ের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরে যে রূপান্তর ঘটছে, তার ধারাবাহিকতা থাকলে ভবিষ্যতে নির্বাচনি রাজনীতিতে দলটি বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

জামায়াতের উত্থান, নাকি খারাপ ফল

আপডেট সময় : ০৯:২৮:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## জাতীয় সংসদে জামায়াতের উত্থান: নতুন মেরুকরণ নাকি ক্ষণস্থায়ী ঝলক?

ঢাকা: ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নতুন মোড় নিয়েছে। এই নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অপ্রত্যাশিত উত্থান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে জামায়াতের এই সাফল্য-ব্যর্থতা কেবল একটি দলের পারফরম্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান, পূর্বাঞ্চলে দুর্বলতা:

জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করেছে। দলটি এককভাবে ৩১.৭৬% এবং জোটবদ্ধভাবে প্রায় ৩৮.৫০% ভোট পেয়েছে, যা তাদের জোটের আসনসংখ্যা ৭৭-এ পৌঁছে দিয়েছে। তবে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসনসংখ্যা কম বলে মনে করছেন অনেকে।

নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রংপুর, রাজশাহী এবং খুলনা এই তিন বিভাগ নিয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চলের ১০৮টি আসনের মধ্যে দলটি প্রায় ১০০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এককভাবে ৫২টি আসনে জয়লাভ করেছে। রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের মধ্যে ১৮টি, রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে ১১টি এবং খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে ২৫টিতে তারা বিজয়ী হয়েছে। এই তিন বিভাগেই জামায়াতের এই চমকপ্রদ ফলাফল ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য এক নতুন বার্তা বহন করছে।

তবে দেশের অন্যান্য প্রধান আসন সংখ্যাবহুল বিভাগগুলোতে জামায়াত আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। বিশেষ করে, রংপুর বিভাগের দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী আসনগুলোতে দলটি সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও কোনো আসন পায়নি। অতীতে এই আসনগুলোতে জামায়াতের উপস্থিতি ছিল শক্তিশালী। সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন আদায়ের যে আশা জামায়াত করেছিল, তা এই দুই জেলায় সফল হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়। যদিও এই জেলাগুলোতে প্রায় ৩০% সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে, এমনকি খুলনা অঞ্চলেও দলটির একমাত্র সংখ্যালঘু প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন।

শহুরে মধ্যবিত্তের আস্থা অর্জন এবং ঢাকার রাজনীতিতে প্রভাব:

জামায়াতে ইসলামী অতীতের নির্বাচনে কখনোই ঢাকা শহরের কোনো আসনে বিজয়ী হতে পারেনি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে তারা জয়লাভ করেছে। এছাড়া, তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আরও একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে, এবং আরও চারটি আসনে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। নিজেদের নির্বাচনী ইতিহাসে এই প্রথম ঢাকা মহানগরে আসন জিততে সক্ষম হয়েছে জামায়াত।

জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণার সুফল জামায়াতকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা এই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল, তারা জামায়াতকে পরিবর্তনের একটি প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। এনসিপির সাথে জোট গঠনও তাদের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। ফলে, ঢাকায় চমক দেখাতে সক্ষম হয়েছে জামায়াত।

এছাড়া, গাজীপুর এবং ফরিদপুর-এ একটি করে আসনে জয়ী হওয়া প্রমাণ করে যে শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে জামায়াতের প্রতি আস্থা বেড়েছে। এমনকি গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় দলটির প্রার্থী অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। জামায়াত যদি ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আরও মনোযোগ দেয়, তবে ভবিষ্যতে তারা এখানে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্যও রাজধানীর ভোটারদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পলিসি সামিট ও ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা কর্মসূচির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে ঢাকার ভোটারদের প্রভাবিত করতে জামায়াত সক্ষম হয়েছে।

চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে দুর্বলতা এবং কওমি আলেমদের প্রভাব:

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য কোনো আসন পায়নি। এসব এলাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি জামায়াতের প্রভাবাধীন এলাকা থেকেও আসন পেয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালী ও টেকনাফের মতো অতীতে জামায়াতের দখলে থাকা আসনগুলোতেও এবার তারা পরাজিত হয়েছে। চট্টগ্রামে ১৬টি আসনের মধ্যে মাত্র দুটি এবং সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জামায়াত কোনো আসন জিততে পারেনি। চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৮টি আসনের মধ্যে ৪২টিতে লড়ে মাত্র তিনটিতে জয়লাভ করেছে দলটি। অর্থাৎ, দেশের পূর্বাঞ্চলের ৭৭টি আসনে জামায়াতের অর্জন মাত্র তিনটি আসন।

চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে জামায়াতের দুর্বল ফলের একটি বড় কারণ হিসেবে কওমি আলেমদের ব্যাপক প্রভাব এবং তাদের সরাসরি বিরোধিতা করাকে উল্লেখ করা হচ্ছে। এছাড়া, মাজারপন্থি এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন না পাওয়ায় ভোটের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এলাকায় বিএনপির ভোট প্রাপ্তি এবং জাতীয় পার্টির ভরাডুবি:

দেশের মধ্যাঞ্চল ও ময়মনসিংহ বিভাগ, যা মূলত আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানেও জামায়াত তেমন কোনো আসন পায়নি। তবে, ময়মনসিংহ বিভাগে প্রথমবারের মতো তিনটি আসনে জয়ী হওয়াকে জামায়াতের জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। জামায়াত নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোট একচেটিয়াভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতীক ধানের শীষে যাওয়ায় এসব আসনে জামায়াত জোট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জিততে পারেনি।

অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলে জামায়াতের উত্থানের ফলে জাতীয় পার্টির কার্যত ভরাডুবি হয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামল থেকে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগে এবার লাঙ্গল প্রতীক কোনো আসনেই জয়ী হতে পারেনি। লালমনিরহাট বাদে এই বিভাগের বাকি ১৯টি আসনের মধ্যে ১৮টিতেই জিতেছে জামায়াত জোট। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুরের একটি আসনে তৃতীয় হয়েছেন এবং দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধার দুটি আসনে নির্বাচন করে একটিতে জামানত হারিয়েছেন। এই বিপর্যয়কে জামায়াতের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ এবং ডা. শফিকের গণমুখী নেতৃত্ব:

জাতীয় নির্বাচনে বেশ কয়েকজন তরুণ শিবির নেতা বিজয়ী হয়েছেন, যা জামায়াতে ইসলামীতে তরুণ নেতৃত্বের প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। ছাত্রশিবিরের সাতজন সাবেক সভাপতিসহ বেশ কয়েকজন তরুণ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কোনো নেতাকে প্রার্থী করতে না পারা এবং এনসিপির তরুণ নেতাদের সাফল্য জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচনে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ক্যারিশমা দেখিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি একটি ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে সাধারণ মানুষের দলে রূপান্তর করে দেশের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত করেছেন। তার গণমুখী নেতৃত্ব এবং নির্বাচনি প্রচারণা সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। যদিও নারী ইস্যুতে তার কিছু বক্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ইসলামপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়।

ভবিষ্যতের রাজনীতিতে জামায়াতের প্রভাব:

নির্বাচনি ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকা সত্ত্বেও বিএনপি সহজ জয় পায়নি। দুইশোর বেশি আসন পেলেও এবারের নির্বাচনে অন্তত ৫০টি আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে মাত্র ১০ হাজারের কম ভোট ব্যবধানে। পাশাপাশি পাঁচ হাজারের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে ২১টি আসনে। রাজধানীর অন্তত চারটি আসন জামায়াত প্রার্থীরা মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।

অতীতে জামায়াত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ ছিল এবং সর্বোচ্চ ৩০টি আসনে নির্বাচন করে ১৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছিলো। এবার জামায়াতের নেতৃত্বে জোট গঠিত হয়েছে এবং জোটবদ্ধ দল থেকে ৯ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা জোট রাজনীতির একটি সফল উদাহরণ।

জামায়াতে ইসলামী জোট ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিএনপির মূল ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরেছে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ সংখ্যালঘু ও আওয়ামী সমর্থকদের বড় অংশের ভোট পেয়েছে বিএনপি। সেদিক দিয়ে জামায়াতের এই বিশাল ভোটপ্রাপ্তি দলটির বড় আকারের উত্থান হিসেবে দেখা যায়। এনসিপি ও ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে এই জোট টেকসই হলে আগামী দিনের ভোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, অল্প সময়ের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরে যে রূপান্তর ঘটছে, তার ধারাবাহিকতা থাকলে ভবিষ্যতে নির্বাচনি রাজনীতিতে দলটি বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারে।