দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি পুরোদমে শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আগামীকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য নতুন সরকারের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয় হলো—কেমন হতে পারে বিএনপির প্রথম মন্ত্রিসভা এবং কোন কোন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।
দলীয় সূত্রমতে, প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভা গঠনে প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সমন্বয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। এই লক্ষ্যে, পুরোনো নেতৃত্বের পাশাপাশি একাধিক নতুন মুখকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের কিছু সদস্যও মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, নির্বাচনের পরদিন থেকেই তারেক রহমান গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত বৈঠক করছেন। সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকা নিয়ে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠজন এবং দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে, দেশের অভিজ্ঞ বিএনপি শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকেও তিনি পরামর্শ গ্রহণ করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের মন্ত্রিসভা কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা এবং একটি জনমুখী ভাবমূর্তি—এই দুটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে সাজানো হচ্ছে। বিশেষ করে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে বিএনপি ভাবছে।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই ছয়টি মন্ত্রণালয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদেরও দেখা যেতে পারে। নির্বাচনে ভালো ফল করা কয়েকজন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যও মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে গুঞ্জন চলছে।
একই সঙ্গে, বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হবে। তবে, বিতর্কিত বা জনসমালোচিত ব্যক্তিদের এড়িয়ে একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মন্ত্রিসভা গঠনের ব্যাপারে দলীয় নেতারা সচেষ্ট থাকবেন বলে জানা গেছে।
দলটির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী একটি কার্যকর এবং বার্তা বহনকারী মন্ত্রিসভা চান। তিনি কেবল রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, বরং যারা বাস্তবে কাজ করতে সক্ষম, তাদেরকেই অগ্রাধিকার দেবেন।
এদিকে, রাজধানীসহ সারা দেশের রাজনৈতিক মহল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। কে কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। তবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে শপথ গ্রহণের দিন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, নতুন সরকার শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে চাইবে। তাই, মন্ত্রিসভা গঠনই হবে সরকারের প্রথম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা।
তরুণ প্রজন্মের আলোচিত মুখ:
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ড. হুমায়ুন কবির (টেকনোক্র্যাট), সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান, ড. মাহদী আমিন (টেকনোক্র্যাট), ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার (টেকনোক্র্যাট), সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম (টেকনোক্র্যাট), প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম (টেকনোক্র্যাট), মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবীন (টেকনোক্র্যাট), ড. রেজা কিবরিয়া, সাঈদ আল নোমান, খন্দকার আবু আশফাক প্রমুখ মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারেন।
প্রবীণ নেতাদের মধ্যে আলোচিত:
বিএনপির ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে এবারও মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়াও, মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একাধিক নেতাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যেতে পারে।
অন্যান্য প্রবীণ নেতাদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন—স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন ফারুক, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া, ইসমাঈল জবিউল্লাহ (টেকনোক্র্যাট), মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং দলটির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল (টেকনোক্র্যাট)।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরাও মন্ত্রিসভায়:
কয়েক বছর আগেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবি এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ফলশ্রুতিতে, নতুন মন্ত্রিসভায় যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতার স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দলের নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা একসঙ্গে ছিলেন, সরকার গঠন প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হবে। অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামোর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণই হবে এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এছাড়াও, গণসংসহ আন্দোলনের আহ্বায়ক জোনায়েদ সাকি, এনডিএম ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ, বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরু এবং ১২ দলীয় জোট প্রধান ও জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নামও টেকনোক্র্যাট কোটায় শোনা যাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























