নতুন যুগের সূচনা: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি’র সরকার গঠন, অপেক্ষায় দেশ
ঢাকা: দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ষষ্ঠবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার, এক নতুন সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে জাতি। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান। এর মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে, যেখানে বাবা প্রেসিডেন্ট এবং মা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এবার পুত্রও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন হচ্ছেন।
ব্যতিক্রমী শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর
সাধারণত বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান এবার এক ভিন্ন আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে এক নতুনত্বের ছোঁয়া লেগেছে। মঙ্গলবার সকালে সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। এরপর বিকেলে রাষ্ট্রপতি নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন।
এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারত ও পাকিস্তানসহ সার্কভুক্ত দেশসমূহ, চীন, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরবসহ মোট ১৩টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ভারতের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং পাকিস্তানের একজন সিনিয়র মন্ত্রীর আগমনের বিষয়টি এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়েছে, যা অনুষ্ঠানটিকে এক আন্তর্জাতিক মাত্রা দেবে। এছাড়াও সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিচারপতি, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, সাংবাদিক এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিএনপি’র দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা ও ক্ষমতার পালাবদল
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসা দলটি পরবর্তীতে বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি আবার সরকার গঠন করে। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার পরিচালনা করে। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়ে বিএনপি পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসছে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে জিয়া পরিবার, বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং দলীয় কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম।
বারবার ক্ষমতায় আসার কারণ: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জনগণের আস্থা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকা বিএনপি কেন বারবার জনগণের আস্থা অর্জন করে ক্ষমতায় আসছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। তাঁদের মতে, বিএনপি একটি পরীক্ষিত এবং দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। দীর্ঘ শাসন পরিচালনার অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। সারা দেশে বিএনপির সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক এবং তৃণমূল পর্যায়ে এর ব্যাপক জনসমর্থন দলটিকে বড় বিজয় অর্জনে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে, স্বৈর ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বিএনপির ধারাবাহিক সংগ্রাম এবং নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ নির্বাচনে তাদের পক্ষে জনরায় এসেছে। ভোটাররা একটি পরিচিত ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক শক্তির উপর আস্থা রাখতে পছন্দ করেছেন। এছাড়াও, বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের উপর অতীতে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অসম্মান করা হয়েছে, তা জনগণ মেনে নিতে পারেনি এবং এর প্রতিক্রিয়াও নির্বাচনে দেখা গেছে।
তরুণ প্রজন্ম ও নারীর ভোট, তারেক রহমানের জনমুখী প্রতিশ্রুতি
এই বারের নির্বাচনে তরুণ ভোটার এবং নারীদের কাছ থেকে বিএনপি ব্যাপক সমর্থন লাভ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কট্টর আদর্শ এবং নারী অধিকার নিয়ে তাদের অবস্থান অনেক ভোটারকে, বিশেষ করে নারীদের, বিএনপির দিকে আকৃষ্ট করেছে। নারীরা চরমপন্থার পরিবর্তে তুলনামূলক উদার ও বহুত্ববাদী শাসনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তারেক রহমানের সরাসরি এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ প্রচারণা তৃণমূল পর্যায়ে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে। তাঁর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার কার্ড’-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপি’র ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং ‘জুলাই চার্টার’-এর প্রতি সমর্থন জানিয়ে সুশাসন ও কাঠামোগত পরিবর্তনের অঙ্গীকার তরুণ ভোটারদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও মিলে গেছে। বিএনপির শক্ত জনভিত্তি, জনগণের কাছে অভিজ্ঞতা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারাটাই এই ভূমিধস বিজয়ের মূল কারণ।
জিয়া পরিবার: ঐক্যের প্রতীক ও উন্নয়নের ধারা
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির যাত্রা শুরু করেন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, ভ্যাট প্রথা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির এই ভূমিধস বিজয়কে ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের মাইলফলক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জিয়া পরিবারের বাবা-মা ও ছেলের ক্ষমতায় আরোহণকে দেশের মানুষ সার্বভৌমত্ব রক্ষা, ঐক্যের প্রতীক এবং উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।
উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশ এই প্রথম নয়, উপমহাদেশে বাবা, মা ও সন্তান প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এটি দ্বিতীয় নজির। এর আগে শ্রীলঙ্কা, ভারত এবং পাকিস্তানেও এমন ঘটনা দেখা গেছে। দুই দশক পর বিএনপি’র ক্ষমতায় ফেরা এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের ফল। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার বিজয়ের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে তারেক রহমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য ছিল, এবারও তিনি নিজেই এই ভূমিধস বিজয়ের মূল চালিকাশক্তি।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর তারেক রহমানের সামনে রয়েছে এক কঠিন পথ। তিনি নিজেও এই পথকে অত্যন্ত প্রতিকূল ও কঠিন বলে অভিহিত করেছেন। নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো: একটি দক্ষ মন্ত্রিসভা গঠন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংকট নিরসন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, মেধাভিত্তিক গুরুত্বারোপ, পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার কতটা সফল হয়, তা সময়ই বলবে।
রিপোর্টারের নাম 























