নতুন বাংলাদেশের কাণ্ডারি: তারেক রহমানের সামনে অগ্নিপরীক্ষা
সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নিরঙ্কুশ বিজয় নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই বিজয় কেবল দলীয় উল্লাসের বিষয় নয়, বরং এ এক গভীর দায়িত্ব ও জনগণের অর্পিত আমানত। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, অনিশ্চয়তা, দমন-পীড়ন এবং স্বৈরাচারী শাসনের পর জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে দৃঢ়তা, সাহস ও প্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছে। এই ভোট ছিল নীরব প্রতিবাদ, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক আশাবাদী ঘোষণা।
প্রত্যাশার আলোয় নতুন দিগন্ত
বহু বছরের বঞ্চনা ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়ার পর জনগণের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের সমতুল্য। এই বিজয় তাই কেবল একটি দলের অর্জন নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে যে তারা পরিবর্তন চায়—প্রাতিষ্ঠানিক ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবর্তন। জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায় যেখানে আইনের শাসন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হবে। গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার কেবল নির্বাচন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার।
শাসনের চ্যালেঞ্জ: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবে উত্তরণ
নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দরজা খুলেছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে সুশাসনের পথে হাঁটা এখন সরকারের দায়িত্ব। ভোট ছিল কেবল সূচনা; এখন কার্যকর নীতিনির্ধারণ, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে আসল পরীক্ষা। বিরোধী অবস্থানে থাকা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু ক্ষমতায় থেকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন। জনগণ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, ফল দেখতে চায়—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা।
আস্থার সুরক্ষা ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থার সুরক্ষা। জনগণ যে বিশ্বাস নিয়ে ভোট দিয়েছে, সেই বিশ্বাস ভঙ্গ হলে হতাশা আরো গভীর হবে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিচক্ষণতা, ভাষণে সংযম, নীতিতে দৃঢ়তা এবং কাজে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। রাষ্ট্র পরিচালনা প্রতিহিংসার নয়, পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। এই নতুন সূচনা সম্ভাবনাময়, কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বপূর্ণ। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে সঠিক পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারে; আর ভুল পদক্ষেপ আবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।
জাতীয় ঐক্যের পথে: দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে
তারেক রহমানকে দলীয় পরিসীমা অতিক্রম করে জাতীয় নেতৃত্বের উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। দলের নেতা হওয়া এক বিষয়, কিন্তু জাতির নেতা হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দায়িত্ব। একটি রাজনৈতিক দলকে পরিচালনা করা মানে নির্দিষ্ট সমর্থকগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণ করা; কিন্তু একটি রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়া মানে ভিন্নমত, ভিন্ন আদর্শ, ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার মানুষদের এক ছাতার নিচে আনা। তাকে একটি সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর রোডম্যাপ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে—যেখানে থাকবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার, প্রশাসনিক জবাবদিহি, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো।
ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
তারেক রহমান শুধু একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেটই পাননি, তিনি একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারও বহন করছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শ, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক দর্শন তার পথচলার ভিত্তি। তবে উত্তরাধিকার রক্ষা হয় কর্মের মাধ্যমে, বক্তব্যে নয়। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক চর্চা ও বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্কার শুরু হতে হবে নিজ দল থেকেই। দলীয় নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সহিংসতা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকতে হবে শূন্য সহনশীলতা—প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা বা যেকোনো খাতে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পররাষ্ট্রনীতি
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সমালোচনা, ভিন্নমত ও মুক্তচিন্তা গণতন্ত্রের শক্তি। তবে স্বাধীনতার অপব্যবহার, উসকানি বা পরিকল্পিত বিভ্রান্তি রোধেও আইনগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে। কোনো একটি দেশের ওপর অতিনির্ভরশীলতা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা নীতি ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো আপস চলবে না। একই সঙ্গে শিক্ষানীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে—কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি।
জাতিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ
নেতৃত্ব মানে শুধু বক্তব্য দেওয়া নয়; নেতৃত্ব মানে দিকনির্দেশনা প্রদান। নেতৃত্ব মানে সংকটকালে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রয়োজনে আপস করা কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আপসহীন থাকা। নেতৃত্ব মানে মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠা—যেখানে মানুষ বিশ্বাস করবে, ‘এই পথেই আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ।’ তাকে জাতিকে অনুপ্রাণিত করতে হবে—বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে যে বাংলাদেশ আবার আত্মমর্যাদায়, অর্থনৈতিক শক্তিতে এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে একটি লক্ষ্য দিতে হবে, যাতে তারা হতাশায় নয়, সম্ভাবনায় বিশ্বাস করে। ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা—সবার কাছে একটি সুসংহত জাতীয় পরিকল্পনা পৌঁছে দিতে হবে।
ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে
এই মুহূর্তে তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় পরিসীমা অতিক্রম করে জাতীয় নেতৃত্বের উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশের রূপকার হতে চান, তবে তাকে একটি সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর রোডম্যাপ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিতে হলে তাদের অংশীদার করতে হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় এবং জাতীয় পুনর্গঠনে। বিভাজনের রাজনীতি নয়, সমন্বয়ের রাজনীতি দরকার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মনোভাব নয়, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তার প্রতিটি পদক্ষেপ ভবিষ্যতের মানচিত্র নির্ধারণ করবে। তিনি যদি জাতির নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন—যিনি সবার কথা শুনেন, সবার জন্য কাজ করেন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন—তবে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকবে না; তা বাস্তবতার রূপ নেবে। জনগণ তাদের আস্থা দিয়েছে। এখন সেই আস্থা রক্ষা করার সময়। অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত সাফল্য। বিজয় ছিল সূচনা। ইতিহাস রচিত হবে সেবার মাধ্যমে।
রিপোর্টারের নাম 























