চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের পতনের পর ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক সংকট আর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রার আজ আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের মাধ্যমেই বিদায় নেবে এই সরকার। বিদায়লগ্নে উপদেষ্টারা কে কোথায় ফিরবেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস: জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া সর্বশেষ ভাষণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করছেন। দায়িত্ব শেষে তিনি কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পোষণ না করে তাঁর সামাজিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও গবেষণায় ফিরে যাবেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ইউনূস সেন্টার’-এর কার্যক্রম এবং দারিদ্র্য বিমোচন সংক্রান্ত বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে তিনি পুনরায় মনোনিবেশ করবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল কেন্দ্রে সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভোট দিয়েছেন এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।
সালেহউদ্দিন আহমেদ ও আসিফ নজরুল: অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি পুনরায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছে। কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে মার্চ মাসের দিকে তিনি কর্মস্থলে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ফিরছেন তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাসে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষকতায় ফেরার পাশাপাশি মৌলিক বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকবেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “খুব অপেক্ষায় আছি, কখন আমার সেই প্রিয় জীবনে ফিরে যাব।”
নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ: অন্তর্বর্তী সরকারের দুই কনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া—যারা ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারে ছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিছুটা রাজনৈতিক। তাঁরা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকছেন। ইতিমধ্যে নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, তাঁরা সংসদে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবে কাজ করবেন এবং একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্যান্য উপদেষ্টাদের পরিকল্পনা: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, দায়িত্ব শেষে তিনি কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে নিয়মিত কলাম ও বই লেখায় মন দেবেন। ভূমি ও খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার পুনরায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমে সক্রিয় হবেন। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তাঁর দীর্ঘদিনের পুরনো কর্মস্থল ‘বেলা’র (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি) কাজে ফিরে যাবেন। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে তিনি ইবাদত ও ধর্মীয় বিষয়ে সময় দেবেন এবং ব্যক্তিগত গাড়ি কিনে সাধারণ নাগরিক জীবনে ফিরবেন।
প্রায় দেড় বছরের এই শাসনামলে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, নির্বাচন সংস্কার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে। দেশবাসী এখন সাগ্রহে অপেক্ষা করছে এই মহানায়কদের বিদায় এবং একটি নির্বাচিত নতুন সরকারের অভিষেকের জন্য।
রিপোর্টারের নাম 

























