২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নির্বাসন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। তবে এই জয় যতটা স্বস্তির, আগামীর পথচলা ততটাই চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা। ৫ আগস্টের পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের সংস্কার কাজ শেষে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশার পারদ এখন আকাশচুম্বী।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো নিম্নরূপ:
১. ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
বিগত দেড় বছরের রাজনৈতিক ডামাডোলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে গেছে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে (প্রায় ৯ শতাংশ)। নতুন সরকারকে প্রথমেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের অস্থিরতা দূর করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা হবে বড় পরীক্ষা। আগামী নভেম্বর ২০২৬-এ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটার কথা রয়েছে, যা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক শুল্কমুক্ত সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। এই কঠিন সময়ে রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম কমানোই হবে সরকারের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা।
২. ভারত ও বৈশ্বিক কূটনীতি পুনর্গঠন
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তারেক রহমানকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে। তারেক রহমান ইতিমধ্যে ‘পারস্পরিক মর্যাদা ও সমতা’র ভিত্তিতে সম্পর্কের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য) পুনরুদ্ধার করা সরকারের জন্য অত্যাবশ্যক।
৩. প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
গত ১৮ মাসে প্রশাসনে পদোন্নতি, বাধ্যতামূলক অবসর এবং পদায়ন নিয়ে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আমলাতন্ত্রের ভেতরে থাকা রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে একটি দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলা নতুন সরকারের জন্য বড় কাজ। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়ার মতে, “দলবাজিমুক্ত প্রশাসন ছাড়া কার্যকর সরকার পরিচালনা অসম্ভব।” এছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তারেক রহমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
৪. আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের ‘মব’ সহিংসতা বন্ধ করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব এবং তাদের রাজনৈতিক দর্শনের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি জটিল সমীকরণ হতে পারে।
৫. কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন
তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী ভাষণে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং বেকারদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় এবং অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ায় যে বেকারত্ব তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান না করলে যুবসমাজের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত: পিপিআরসি-র নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, “শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে একটি দেশ চালানো সম্ভব নয়; সুশাসন, স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা এবং একটি মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তিই হবে নতুন সরকারের স্থায়িত্বের চাবিকাঠি।” তারেক রহমানের জন্য এই মুহূর্তটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার যেমন সুযোগ, তেমনি সামান্য ভুল পদক্ষেপে জনরোষে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















