ঢাকা ০৭:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণতন্ত্রে উত্তরণের দুই মহানায়ক: একটি নতুন ভোরের গল্প

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪০:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ ১৬ বছরের শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের মূল ধারায় ফিরেছে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে আজ দেশ ও বিদেশের বিশ্লেষকেরা ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের দুই মহানায়ক’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তাঁদের দৃঢ় সংকল্প ও নিরপেক্ষ অবস্থান ছাড়া এই অভাবনীয় পরিবর্তন সম্ভব ছিল না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন সামনে ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, ড. ইউনূস ক্ষমতা ছাড়তে দেরি করবেন কি না, কিংবা সেনাবাহিনী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেবে কি না। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে এই দুই ব্যক্তিত্ব তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।

একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের চিত্র গত ১২ ফেব্রুয়ারি উৎসবমুখর পরিবেশে সারা দেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৯.৪৪ শতাংশ এবং একই সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০.৮৪ শতাংশ। এই নির্বাচনের বিশেষ দিক ছিল এর সহিংসতাহীন পরিবেশ। প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্যের উপস্থিতি এবং কঠোর নজরদারির কারণে কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ভোটাররা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

বিজয় ও নতুন সংসদীয় সমীকরণ নির্বাচনের ফলাফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি একাই ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ৬টি আসন পেয়ে চমক দেখিয়েছে।

জুলাই সনদ ও গণভোটের ঐতিহাসিক রায় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটে জনগণ বিপুলভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ মানুষ এই সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছে, যা শাসন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করেছে। এই সনদের অন্যতম প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করা এবং একটি উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট দ্বিকক্ষীয় আইনসভা গঠন।

আগামীর পথে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভা ও সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। তারেক রহমান তাঁর নির্বাচন-উত্তর বার্তায় দেশ গড়ার কাজে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে যেভাবে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাঁদের হাত ধরেই ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর যে যাত্রা শুরু হলো, তা দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান রাজধানীতে পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ, সীমান্তে চরম উত্তেজনা

গণতন্ত্রে উত্তরণের দুই মহানায়ক: একটি নতুন ভোরের গল্প

আপডেট সময় : ০২:৪০:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘ ১৬ বছরের শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের মূল ধারায় ফিরেছে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে আজ দেশ ও বিদেশের বিশ্লেষকেরা ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের দুই মহানায়ক’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তাঁদের দৃঢ় সংকল্প ও নিরপেক্ষ অবস্থান ছাড়া এই অভাবনীয় পরিবর্তন সম্ভব ছিল না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন সামনে ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, ড. ইউনূস ক্ষমতা ছাড়তে দেরি করবেন কি না, কিংবা সেনাবাহিনী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেবে কি না। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে এই দুই ব্যক্তিত্ব তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।

একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের চিত্র গত ১২ ফেব্রুয়ারি উৎসবমুখর পরিবেশে সারা দেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৯.৪৪ শতাংশ এবং একই সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০.৮৪ শতাংশ। এই নির্বাচনের বিশেষ দিক ছিল এর সহিংসতাহীন পরিবেশ। প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্যের উপস্থিতি এবং কঠোর নজরদারির কারণে কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ভোটাররা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

বিজয় ও নতুন সংসদীয় সমীকরণ নির্বাচনের ফলাফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি একাই ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ৬টি আসন পেয়ে চমক দেখিয়েছে।

জুলাই সনদ ও গণভোটের ঐতিহাসিক রায় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটে জনগণ বিপুলভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ মানুষ এই সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছে, যা শাসন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করেছে। এই সনদের অন্যতম প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করা এবং একটি উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট দ্বিকক্ষীয় আইনসভা গঠন।

আগামীর পথে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভা ও সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। তারেক রহমান তাঁর নির্বাচন-উত্তর বার্তায় দেশ গড়ার কাজে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে যেভাবে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাঁদের হাত ধরেই ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর যে যাত্রা শুরু হলো, তা দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।