দীর্ঘ ১৮ বছর পর ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন তারেক রহমান। দেশজুড়ে ‘তারেক বসন্ত’ নামে পরিচিতি পাওয়া গণরায় নিয়ে তিনি যখন নতুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে প্রস্তুত, তখন তাঁর সামনে রয়েছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের বিশাল চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার আদলে একটি সৎ ও দক্ষ কেবিনেট গঠনই হতে পারে তাঁর সরকারের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গণমানুষের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে অনেকে এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। বারবার রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তিনি জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে তাঁর এই প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়াকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি, নিপীড়ন ও নির্যাতনের পথ অতিক্রম করে তাঁর নেতৃত্বগুণ আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তাঁর ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বে দেশের মানুষ যে ভালোবাসা ও সমর্থন দেখিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে যা ‘তারেক বসন্ত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে, তা তারই সুস্পষ্ট প্রমাণ।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘প্রার্থী নয়, মার্কা দেখে ভোট দিন’, ‘শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়াকে ভোট দিন’, ‘তারেক রহমানকে ভোট দিন’ – এই আহ্বানগুলোতে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে ধানের শীষকে বিজয়ী করেছে। ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও তারেক রহমানের গণমানুষের দুয়ারে পৌঁছে যাওয়া এবং জেলা, মহানগর ও বিভাগীয় শহরগুলোতে বিরামহীন ভ্রমণ ছিল অনেকের কল্পনারও বাইরে। যে বাংলাদেশ থেকে ২০০৮ সালে ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে আহত অবস্থায় দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল এবং যে দেশের ফ্যাসিবাদী শক্তি তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল, সেই বাংলাদেশের মানুষই আজ তাঁকে দেশ পুনর্গঠনের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ‘দ্য প্যাট্রিয়ট’ কবিতার প্রথম অংশের মতোই বাংলার মানুষ তাঁর চলার পথে যেন গোলাপের পাপড়ি বিছিয়ে দিয়েছে। শহর ও গ্রামজুড়ে রাস্তা, দালান ও জনপদে প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর বিজয়ধ্বনি, মানুষ পতাকা হাতে তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছে এবং সর্বশেষ নির্বাচনে তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছে।
এখন নতুন সরকারের সামনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব। অসংখ্য লেখক, কবি ও সাংবাদিক হয়তো এই বিজয়গাঁথা নিয়ে উচ্ছ্বসিত লেখনী প্রকাশ করবেন। বিজয়ের পেছনের গল্প, তারেক রহমানের পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার, পাশাপাশি নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও ত্যাগ – সবই তাদের লেখায় স্থান পাবে। একই সঙ্গে অনেকে আসন্ন প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাব-নিকাশ কষবেন। দীর্ঘ ১৮ বছর পর তাঁর দল বিএনপি ক্ষমতায় আসায় নেতাকর্মীদের মনে নতুন করে আশার আলো জেগেছে। এই আশা ও প্রত্যাশার সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের কাছে দেওয়া ‘পরিকল্পনা’ ও ‘অঙ্গীকার’ বাস্তবায়নই তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের মূল দায়িত্ব হয়ে উঠবে। তাঁর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পথ যেমন কঠিন ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ ছিল, তেমনি বর্তমান ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর বাংলাদেশ পরিচালনাও সহজ হবে না। জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে পারাই হবে তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দেশের মানুষ মূলত নেতার ওপর আস্থা রাখেন শর্ত সাপেক্ষে। নতুন সরকারের ওপর মানুষের আস্থার প্রধান শর্তই হলো দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা। দুর্নীতি-অনিয়মের লাগাম টেনে ধরে মানুষকে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ করে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন নির্বাচিত সরকারের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি করা একটি কঠিন কাজ। এই কঠিন দায়িত্বটি পালনের উপযুক্ত লোক হিসেবে জনগণ আপনাকেই বেছে নিয়েছেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সরকারকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠোর এবং বিচক্ষণতা দেখাতে হবে। এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো:
প্রথমত: সৎ, দক্ষ এবং গতিশীল ব্যক্তিদের নিয়েই একটি কেবিনেট গঠন করা আবশ্যক। শহীদ জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভাকে এক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি দেশের বিভিন্ন সেক্টরের সবচেয়ে সফল পেশাদারদের তাঁর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যেটি আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে সফল কেবিনেট হিসেবে বিবেচিত। নতুন মন্ত্রী পরিষদে একজন সদস্যও যেন অর্থনৈতিক ও নৈতিকতার নিরিখে অসৎ হওয়ার সুযোগ না পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। কেবিনেটকে কার্যকর ও সৎ রাখতে মন্ত্রী পরিষদের নিয়মিত রিভিউ এবং ওয়াচডগ সিস্টেম রাখা অত্যাবশ্যক।
দ্বিতীয়ত: দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জনগণ চায়, যেকোনো সরকারি দপ্তরে গেলে মানুষ হয়রানি ছাড়া তার কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে। এটুকু নিশ্চিত করতে পারলেই ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় থাকবে। এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হতে পারে আমলাতন্ত্র। ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে আমলাতন্ত্রই তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও বিচার বিভাগের কাঠামোগত সংস্কার করে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
তৃতীয়ত: নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া সকল ইশতেহার বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়মিত ফলোআপ কার্যক্রম রাখতে হবে। সবকিছু একদিনে আলাদিনের চেরাগের মতো বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবে জনগণের কাছে সরকারের আন্তরিকতা ও চেষ্টার দৃশ্যমান প্রমাণ রাখা জরুরি।
চতুর্থত: বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং’ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধে দুই ধাপের পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা আগেই দেওয়া হয়েছিল। কোনো নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠলে দলীয়ভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দল ও সরকারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সদা তৎপর থাকতে হবে।
পঞ্চমত: নতুন প্রজন্মের সাথে সরকারের সংলাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির চর্চা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে সরকারকে উন্নয়নমুখী কাজে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ করে দেবে।
ষষ্ঠত: সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে অপেক্ষাকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকারের পরিকল্পনা ও ভিশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক-বীমায় যে শতকোটি টাকার লোপাট হয়েছে, নতুনভাবে যেন এমন লুটেরার তৈরি না হয় – সেটা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এমন হাজারো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারকে হয়তো প্রতিটি দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে। এর মধ্যেও রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ‘দ্য প্যাট্রিয়ট’ কবিতার শেষাংশ স্মরণে রাখা জরুরি। যে জনতা একজন নেতাকে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বরণ করেছিল, সেই জনগণই তাকে ঢিল মেরে রক্তাক্ত করে এলাকা ছাড়া করেছে। যদি সরকার তার অঙ্গীকার পূরণ করতে না পারে, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ভাষায়, সৃষ্টিকর্তা কি আমার কাজের প্রতিদান দিল? অতএব, সরকার যে মানুষের কল্যাণের জন্য সততার সাথে চেষ্টা করছে, সেটি জনগণকে বুঝতে হবে, বোঝাতে হবে এবং তখনই ইতিবাচক প্রতিদান পাওয়া যেতে পারে। দেশের মানুষের এতটুকু বিশ্বাস তাঁর প্রতি আছে বলেই আজ অনেকের কাছে অনিশ্চিত এক নির্বাসন থেকে ফিরে তিনি জনগণের ভালোবাসা ও আস্থার জায়গায় আসীন হয়েছেন। আশা করা যায়, বাংলাদেশের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই আস্থা রক্ষা করতে সক্ষম হবেন। তাঁর জনপ্রিয় স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ যেন কাজে এবং মননেও প্রমাণ করতে তিনি সক্ষম হন, জাতি এই প্রত্যাশা করে।
রিপোর্টারের নাম 

























