দেশের দেশপ্রেমিক নাগরিক মহলে সম্প্রতি একটি প্রবাদ বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে—‘যারা লড়াই করে তারা বীর, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা মীর জাফর, আর যারা দেশ ছেড়ে পালায় তারা নিয়াজি।’ এই বাক্যটি কেবল একটি শব্দসমষ্টি নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের বর্তমান সংকটের এক গভীর প্রতিফলন। পাকিস্তানি সামরিক ইতিহাসে একটি বিদ্রূপাত্মক প্রবাদ প্রচলিত ছিল, যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে—‘যারা মারা যায় তারা শহীদ, যারা বেঁচে থাকে তারা গাজী, আর যারা পালিয়ে যায় তারা নিয়াজি।’ ১৯৭১ সালে জেনারেল নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পর্যাপ্ত যুদ্ধ সরঞ্জাম ও সুপ্রশিক্ষিত সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন।
আজ যখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, তখন ‘নিয়াজি’ শব্দটি কেবল একজন পরাজিত জেনারেলের নাম নয়, বরং এটি কাপুরুষোচিত ও আত্মসমর্পণকারী মানসিকতার এক প্রতীক। যারা জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্য দেশের প্রতি নতজানু হয় অথবা বিচার এড়ানোর জন্য সংকটের সময় পালিয়ে যায়, তারাই আধুনিক বাংলার ‘নিয়াজি’।
মীর জাফর ও জগৎ শেঠ: ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তি
পলাশীর ষড়যন্ত্রে মীর জাফরের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ এবং ঘষেটি বেগমের মতো চরিত্রগুলো ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বর্তমান বাংলাদেশে যখন কিছু ব্যক্তি দেশের চেয়ে প্রতিবেশী দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, তখন ইতিহাসের এই চরিত্রগুলো নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে।
জগৎ শেঠ পরিবারের বার্ষিক আয় বর্তমান মুদ্রামানে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার সমতুল্য ছিল। আজকের দিনেও অনেক উচ্চপদস্থ আমলা ও সচিবের বিপুল সম্পদ ঠিক একই রকম। এই আমলারা জগৎ শেঠের মতোই বিদেশি শক্তির স্বার্থ হাসিলের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তন করতে দ্বিধা করেন না।
রায় দুর্লভ ছিলেন নবাবের দেওয়ান। যুদ্ধের ময়দানে সশরীরে উপস্থিত থেকেও তিনি তার বিশাল বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রেখেছিলেন। আজকের আমলাতন্ত্রেও এমন অনেক ‘রায় দুর্লভ’ রয়েছেন, যারা জাতীয় সংকটের মুহূর্তে দেশের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে নির্লিপ্ত থাকেন। এই নির্লিপ্ততা পরোক্ষভাবে শত্রুর হাতকেই শক্তিশালী করে।
১৬ বছরের অবক্ষয় ও ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
প্রশাসনিক ও নৈতিক এই অবক্ষয় হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে আমরা দেখেছি কীভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে একটি পরাধীনতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
দুই দশক আগে একটি সংবেদনশীল সংস্থায় ডেপুটেশনে কর্মরত থাকাকালীন আমি সিভিল আমলাতন্ত্র, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কার্যকলাপ ও মানসিকতা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার সেই পর্যবেক্ষণে আমি দেখেছি, দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত অনাগ্রহ এবং দেশপ্রেমের তীব্র অভাব। যেখানে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতেন, সেখানে সিভিল আমলারা প্রায়শই বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ খোঁজা এবং বিদেশি প্রভুদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকতেন। তাদের এই অনীহাপূর্ণ আচরণ আমাকে তখন অত্যন্ত হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছিল। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে এই আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যার ফলে সচিবালয়ের ফাইলবন্দি হয়ে আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব আজ পণবন্দি হয়ে পড়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























