ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক ও ক্রীড়াঙ্গন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠনের আপত্তির মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)-এর নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) মোস্তাফিজকে চুক্তি থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার ও জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জন এবং দেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ ডিসেম্বর, যখন আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত নিলামে ২০২৫ সালের আইপিএল টুর্নামেন্টের জন্য কেকেআর ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কিনে নেয়। কেকেআর-এর মালিকানা অভিনেতা শাহরুখ খান ও অভিনেত্রী জুহি চাওলার। এরপর ১৮ ডিসেম্বর বিসিসিআইয়ের অনুরোধে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলার জন্য ছাড়পত্র দেয়। তবে মোস্তাফিজকে কেকেআর কেনার পরপরই ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী কিছু নেতা এর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি ও হুমকি দিতে শুরু করেন। মধ্যপ্রদেশের মহাদেব মন্দিরের প্রধান উপাসক মহাবীর নাথ ২৭ ডিসেম্বর মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান এবং তাকে খেলালে পিচ নষ্ট করে দেওয়ার হুমকি দেন। উত্তর প্রদেশের বিজেপি নেতা সংগীত সোম ৩০ ডিসেম্বর মোস্তাফিজকে কেনায় কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ এবং ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ভারতে খেলতে এলে মোস্তাফিজের পা বিমানবন্দরের বাইরে রাখতে পারবেন না। একইভাবে হিন্দু গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুর শাহরুখ খান এবং কেকেআর ম্যানেজমেন্টের প্রতি মোস্তাফিজকে না খেলানোর আহ্বান জানান।
এই ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে গত ৩ জানুয়ারি বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর কারণে কেকেআরকে বাংলাদেশি খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই ঘোষণার পরপরই কেকেআর মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে এবং জানায়, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি নেতা সংগীত সোম বলেন, ১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। তিনি এটিকে পুরো দেশের হিন্দুদের বিজয় বলেও অভিহিত করেন। উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা নরেন্দ্র কাশ্যপও বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তারা দেশের আবেগ-অনুভূতি বুঝেছেন এবং বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দিয়েছেন, যেহেতু বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চলছে। দেবকীনন্দন ঠাকুরও বিসিসিআইকে ধন্যবাদ জানান।
তবে ভারতের কিছু নেতা মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। উত্তর প্রদেশ বিধান সভার বিরোধী নেতা মাতা প্রসাদ পান্ডে ও কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্র রাজপুত বলেন, মুসলিম হওয়ার কারণে শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ বা ‘দেশদ্রোহী’ বলা হচ্ছে। ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা ওম প্রকাশ রাজভর সংগীত সোমের মন্তব্যের সমালোচনা করেন। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভা সদস্য শশী থারুর বলেন, ক্রিকেটকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ভার বহন করতে দেওয়া উচিত নয়। তিনি উল্লেখ করেন, মোস্তাফিজ একজন ক্রিকেটার, এসব ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণাসূচক কথা, হামলা বা এমন কর্মকাণ্ডকে কখনো সমর্থন করেননি। থারুর প্রশ্ন তোলেন, খেলোয়াড়টি যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে কী হতো? এখানে কাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে—একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তার ধর্মকে? তিনি আরও বলেন, খেলাধুলাকে এভাবে নির্বিচারে রাজনৈতিক রঙে রাঙানো আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? ভারতের সাবেক ক্রিকেটার মদন লাল বলেন, ওপর মহলের চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইপিএল থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার এই ঘটনা বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। দেশের মানুষ এতে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সরকারের পক্ষ থেকেও এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রথমত, ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে বাংলাদেশ দল ভারতে যায়নি। দ্বিতীয়ত, সরকারের তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রণালয় দেশে আইপিএলের খেলা সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার ভারতে পালানোর পর থেকে ভারতের কিছু ব্যক্তি ও মিডিয়া তথ্যপ্রমাণ ছাড়া এ দেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুসলমানরা হিন্দুদের মন্দির-ঘরবাড়ি পাহারা দিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির ওপর যদি হামলার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা কোনোভাবেই ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে হয়নি, সেটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক কারণেই হয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী যেই কারণে হামলার শিকার হয়েছেন, একই কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হামলার শিকার হতে পারেন। এখানে পুরো ব্যাপারটিই রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িকতা বা সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো ব্যাপার নেই। বাংলাদেশ সব ধরনের সহিংসতা ও সন্ত্রাসের বিরোধী এবং সব সময়ই শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ঐতিহাসিককাল থেকেই এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মিলেমিশে একসঙ্গে বসবাস করছে এবং প্রত্যেকেই তার নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করছে।
বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারত মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দিয়েছে। অথচ ভারতেই মসজিদ ভেঙে মন্দির করা হয়েছে, গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে অনেক মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, হিজাব পরিধান করায় বহু নারীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে এবং মুসলমানদের জোর করে ‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’ বলানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। এভাবে ভারতেই সংখ্যালঘুরা প্রায়ই হেনস্তার শিকার। বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমান একজন অত্যন্ত উঁচুমানের পেশাদার ক্রিকেটার এবং রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গেও যুক্ত নন। অথচ ভারত তাকে বলির পাঁঠা বানিয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 























