ঢাকা ০৯:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জনগণের রায়: নতুন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নির্বাচনী পরীক্ষা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১১:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনীতি বরাবরই সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রতিটি ধাপে জনগণই ছিল মূল চালিকাশক্তি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, এদেশের নানা ধর্ম ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পর্যায়ে ভিন্নমত ও মতপার্থক্যের জন্ম দিয়েছে, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ধারণার বিকাশে সহায়ক হয়েছে। বিগত দেড় দশক বাদে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সব পর্যায়েই সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণ ছিল এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষার জন্য রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। তারা রাজনীতিকে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখে। এই প্রেক্ষাপটে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনটি নানা কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় দেড় যুগ পর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা দেশের সব বয়সের মানুষের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ-উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে। তাই, এই নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে সীমিত থাকার সুযোগ কম।

পূর্বে নানা সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া ১২টি সংসদ নির্বাচন, যার কিছু স্বীকৃত এবং কিছু বিতর্কিত ছিল, সেগুলোর থেকে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের এই নির্বাচন পদ্ধতিগত ও বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্বৈত ভোট এবং উচ্চ ও নিম্নকক্ষের মতো জটিল সমীকরণের এই নির্বাচনকে এক মহাযজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এটি জাতির জন্য একদিকে যেমন একটি বিরাট পরীক্ষা, তেমনই অন্যদিকে একটি সুবর্ণ সুযোগও বটে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পশ্চিমা বিশ্ব থেকে প্রাচ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তখন এই নির্বাচনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এর সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্বে দেশের ৫৪ বছরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগাভাগি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতনের পর, ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির মূল নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে দলটির একসময়ের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের তুলনায় বিএনপির অভিজ্ঞতা বেশি এবং তারা পরীক্ষিত। দলটির রয়েছে বিশাল জনভিত্তি ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো। চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া এবং একাধিকবার এককভাবে সরকার গঠনের ঈর্ষণীয় সাফল্য তাদের দখলে রয়েছে।

অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্বে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, তা বলা যেতে পারে। পূর্ববর্তী সময়ে সংসদে কিছু আসন পেতে দলটিকে বিএনপির ওপর নির্ভর করতে হতো। এর মূল কারণ ছিল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দমনপীড়নের রাজনীতি। তবে, হাসিনার পতনের পর এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নাটকীয় উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই উত্থানের পেছনে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনই আন্তর্জাতিক বিষয়ও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রথমত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমর্থক শক্তির সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের কারণে স্বাধীনতার পর থেকেই দলটির ওপর একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কলঙ্ক চাপিয়ে দেওয়ার যে আওয়ামী বয়ান প্রচলিত ছিল, তা বর্তমানে তেমন কার্যকর নয়। এর একটি বড় কারণ হলো, বর্তমানে জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ তরুণ। এই তরুণদের প্রায় সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব, যুদ্ধাপরবর্তী প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই দুর্দমনীয় প্রজন্মের নিজস্ব চিন্তাধারা রয়েছে। ফরাসি দার্শনিক ভিক্টর হুগোর উক্তি স্মরণীয়— “Nothing is more powerful than an idea whose time has reached.” এই প্রেক্ষাপটে, যারা পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারছেন না, তাদের এই তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাখ্যান করছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শব্দের কারসাজি ও ক্ষমতার রাজনীতি: ভাষা যখন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার

জনগণের রায়: নতুন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নির্বাচনী পরীক্ষা

আপডেট সময় : ০৮:১১:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতি বরাবরই সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রতিটি ধাপে জনগণই ছিল মূল চালিকাশক্তি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, এদেশের নানা ধর্ম ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পর্যায়ে ভিন্নমত ও মতপার্থক্যের জন্ম দিয়েছে, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ধারণার বিকাশে সহায়ক হয়েছে। বিগত দেড় দশক বাদে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সব পর্যায়েই সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণ ছিল এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষার জন্য রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। তারা রাজনীতিকে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখে। এই প্রেক্ষাপটে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনটি নানা কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় দেড় যুগ পর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা দেশের সব বয়সের মানুষের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ-উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে। তাই, এই নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে সীমিত থাকার সুযোগ কম।

পূর্বে নানা সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া ১২টি সংসদ নির্বাচন, যার কিছু স্বীকৃত এবং কিছু বিতর্কিত ছিল, সেগুলোর থেকে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের এই নির্বাচন পদ্ধতিগত ও বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্বৈত ভোট এবং উচ্চ ও নিম্নকক্ষের মতো জটিল সমীকরণের এই নির্বাচনকে এক মহাযজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এটি জাতির জন্য একদিকে যেমন একটি বিরাট পরীক্ষা, তেমনই অন্যদিকে একটি সুবর্ণ সুযোগও বটে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পশ্চিমা বিশ্ব থেকে প্রাচ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তখন এই নির্বাচনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এর সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্বে দেশের ৫৪ বছরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগাভাগি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতনের পর, ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির মূল নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে দলটির একসময়ের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের তুলনায় বিএনপির অভিজ্ঞতা বেশি এবং তারা পরীক্ষিত। দলটির রয়েছে বিশাল জনভিত্তি ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো। চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া এবং একাধিকবার এককভাবে সরকার গঠনের ঈর্ষণীয় সাফল্য তাদের দখলে রয়েছে।

অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্বে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, তা বলা যেতে পারে। পূর্ববর্তী সময়ে সংসদে কিছু আসন পেতে দলটিকে বিএনপির ওপর নির্ভর করতে হতো। এর মূল কারণ ছিল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দমনপীড়নের রাজনীতি। তবে, হাসিনার পতনের পর এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নাটকীয় উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই উত্থানের পেছনে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনই আন্তর্জাতিক বিষয়ও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রথমত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমর্থক শক্তির সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের কারণে স্বাধীনতার পর থেকেই দলটির ওপর একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কলঙ্ক চাপিয়ে দেওয়ার যে আওয়ামী বয়ান প্রচলিত ছিল, তা বর্তমানে তেমন কার্যকর নয়। এর একটি বড় কারণ হলো, বর্তমানে জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ তরুণ। এই তরুণদের প্রায় সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব, যুদ্ধাপরবর্তী প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই দুর্দমনীয় প্রজন্মের নিজস্ব চিন্তাধারা রয়েছে। ফরাসি দার্শনিক ভিক্টর হুগোর উক্তি স্মরণীয়— “Nothing is more powerful than an idea whose time has reached.” এই প্রেক্ষাপটে, যারা পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারছেন না, তাদের এই তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাখ্যান করছে।