ঢাকা ০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নবীযুগের নেতৃত্ব নির্বাচন: ক্ষমতা নয়, আমানত ও জনআস্থার ভিত্তি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৫:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

নেতৃত্ব কেবল একটি পদ নয়, বরং মানুষের প্রতি মানুষের এক বিশাল দায়িত্ব। ইতিহাসের পরতে পরতে বহু শাসক ও শাসনব্যবস্থার উল্লেখ থাকলেও, আদর্শ নেতৃত্বের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর শাসনামলে নেতা নির্বাচনের যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, তা ছিল ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিকতা ও আমানতদারিতার এক সুমহান নিদর্শন, যা আজও মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় এক আদর্শ হয়ে আছে।

বর্তমান বিশ্বে নেতা বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণত ভোটাধিকার প্রয়োগ করা হয় এবং একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে মহানবী (সা.)-এর যুগে নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতি বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো ছিল না। বরং সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হতো ভিন্ন কিছু মৌলিক নীতির ওপর।

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই সেই রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ওফাতের পর পর্যায়ক্রমে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মদিনা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করেন। নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশায় সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ওফাতের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দেখানো আদর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। সেই যুগে নেতা নির্বাচন হতো মূলত কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা, প্রার্থীর নৈতিক যোগ্যতা, জনগণের আস্থা এবং পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবের চেয়ে দায়িত্ববোধ ও আমানতের গুরুত্বকেই তখন অধিক প্রাধান্য দেওয়া হতো।

মদিনায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ভিত্তি
হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর:
১. ওহি ও আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা।
২. জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য ও বিশ্বাস।
৩. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আমানতদারিতা।
মদিনার আনসার ও মুহাজিরদের ‘বাইয়াত’ বা আনুগত্যের শপথের মাধ্যমেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

বাইয়াত: নেতৃত্বের সামাজিক স্বীকৃতি
নবীযুগে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ছিল বাইয়াত। আকাবার বাইয়াতের মাধ্যমে মদিনাবাসী রাসুল (সা.)-কে তাঁদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি কোনো জোরপূর্বক শপথ ছিল না; বরং বিশ্বাস, আস্থা ও দায়িত্ববোধের গভীর অনুভূতি থেকে মদিনার মানুষ স্বেচ্ছায় রাসুল (সা.)-কে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

যোগ্যতা ও চরিত্রই ছিল মূল মানদণ্ড
নবীযুগে নেতৃত্ব নির্ধারণে বংশমর্যাদা, সম্পদ কিংবা সামাজিক ক্ষমতাকে মুখ্য করা হতো না। বরং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই নীতির বাস্তব উদাহরণ হলো—এক সময়ের দাস হজরত বিলাল (রা.)-কে সম্মানজনক দায়িত্ব দেওয়া এবং অল্প বয়সী হজরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কে সেনাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করা।

পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরআন ও ওহির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে ‘শূরা’ বা পরামর্শ গ্রহণ করতেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নবীযুগের নেতৃত্ব ছিল অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক।

বিশ্বনবী (সা.)-এর যুগের এই নেতৃত্বব্যবস্থা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, নেতৃত্ব কোনো ক্ষমতার পদ নয়, বরং এটি একটি মহান আমানত। যোগ্যতা, উন্নত চরিত্র, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের কল্যাণই ছিল নেতা নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড। ক্ষমতার লোভ নয়, বরং আল্লাহভীতি ও জনগণের আস্থাই একজন নেতাকে প্রকৃত অর্থে মর্যাদাবান করে তোলে। আজকের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যদি নবীজি (সা.)-এর প্রদর্শিত এই কালজয়ী আদর্শ অনুসরণ করা যায়, তবে নেতৃত্ব ফিরে পেতে পারে তার প্রকৃত মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রূপ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

নবীযুগের নেতৃত্ব নির্বাচন: ক্ষমতা নয়, আমানত ও জনআস্থার ভিত্তি

আপডেট সময় : ০৮:০৫:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নেতৃত্ব কেবল একটি পদ নয়, বরং মানুষের প্রতি মানুষের এক বিশাল দায়িত্ব। ইতিহাসের পরতে পরতে বহু শাসক ও শাসনব্যবস্থার উল্লেখ থাকলেও, আদর্শ নেতৃত্বের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর শাসনামলে নেতা নির্বাচনের যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, তা ছিল ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিকতা ও আমানতদারিতার এক সুমহান নিদর্শন, যা আজও মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় এক আদর্শ হয়ে আছে।

বর্তমান বিশ্বে নেতা বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণত ভোটাধিকার প্রয়োগ করা হয় এবং একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে মহানবী (সা.)-এর যুগে নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতি বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো ছিল না। বরং সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হতো ভিন্ন কিছু মৌলিক নীতির ওপর।

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই সেই রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ওফাতের পর পর্যায়ক্রমে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মদিনা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করেন। নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশায় সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ওফাতের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দেখানো আদর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। সেই যুগে নেতা নির্বাচন হতো মূলত কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা, প্রার্থীর নৈতিক যোগ্যতা, জনগণের আস্থা এবং পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবের চেয়ে দায়িত্ববোধ ও আমানতের গুরুত্বকেই তখন অধিক প্রাধান্য দেওয়া হতো।

মদিনায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ভিত্তি
হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর:
১. ওহি ও আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা।
২. জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য ও বিশ্বাস।
৩. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আমানতদারিতা।
মদিনার আনসার ও মুহাজিরদের ‘বাইয়াত’ বা আনুগত্যের শপথের মাধ্যমেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

বাইয়াত: নেতৃত্বের সামাজিক স্বীকৃতি
নবীযুগে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ছিল বাইয়াত। আকাবার বাইয়াতের মাধ্যমে মদিনাবাসী রাসুল (সা.)-কে তাঁদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি কোনো জোরপূর্বক শপথ ছিল না; বরং বিশ্বাস, আস্থা ও দায়িত্ববোধের গভীর অনুভূতি থেকে মদিনার মানুষ স্বেচ্ছায় রাসুল (সা.)-কে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

যোগ্যতা ও চরিত্রই ছিল মূল মানদণ্ড
নবীযুগে নেতৃত্ব নির্ধারণে বংশমর্যাদা, সম্পদ কিংবা সামাজিক ক্ষমতাকে মুখ্য করা হতো না। বরং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই নীতির বাস্তব উদাহরণ হলো—এক সময়ের দাস হজরত বিলাল (রা.)-কে সম্মানজনক দায়িত্ব দেওয়া এবং অল্প বয়সী হজরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কে সেনাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করা।

পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরআন ও ওহির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে ‘শূরা’ বা পরামর্শ গ্রহণ করতেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নবীযুগের নেতৃত্ব ছিল অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক।

বিশ্বনবী (সা.)-এর যুগের এই নেতৃত্বব্যবস্থা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, নেতৃত্ব কোনো ক্ষমতার পদ নয়, বরং এটি একটি মহান আমানত। যোগ্যতা, উন্নত চরিত্র, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের কল্যাণই ছিল নেতা নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড। ক্ষমতার লোভ নয়, বরং আল্লাহভীতি ও জনগণের আস্থাই একজন নেতাকে প্রকৃত অর্থে মর্যাদাবান করে তোলে। আজকের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যদি নবীজি (সা.)-এর প্রদর্শিত এই কালজয়ী আদর্শ অনুসরণ করা যায়, তবে নেতৃত্ব ফিরে পেতে পারে তার প্রকৃত মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রূপ।